ওয়াজেদুর রহমান কনক


আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা দিবস বাংলাদেশের মতো একটি সক্রিয় বদ্বীপের জন্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ক্যালেন্ডারীয় ইভেন্ট নয়, বরং এটি এই ভূখণ্ডের অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য রাজনৈতিক ও পরিবেশগত ঘোষণা। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই দিবসটির গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এদেশের কৃষি, মৎস্য সম্পদ, যোগাযোগ এবং সর্বোপরি বাস্তুসংস্থানিক ভারসাম্য প্রায় ৭০০টিরও বেশি নদী ও তাদের উপনদীর ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন হিমালয়ের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, তখন নদী রক্ষা দিবস বাংলাদেশের জন্য আন্তঃসীমান্তীয় নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার এক বিশ্বজনীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে বিদ্যমান অমীমাংসিত ইস্যুগুলো এই দিনে আন্তর্জাতিক জনমতের সামনে জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয়। দেশের ভেতরেও অবৈধ দখলদারিত্ব, কলকারখানার বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনর্জীবিত করার জন্য এই দিবসটি নীতিনির্ধারক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি ‘এলার্ম বেল’ হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয় অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও তৃণমূলমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন যেমন বাপা (BAPA), রিভারাইন পিপল এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ সম্মিলিতভাবে এই দিনে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে পদযাত্রা, মানববন্ধন ও ‘নদী সমাবেশ’ আয়োজন করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকীভাবে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে শপথ গ্রহণ বা মৃত নদীর কফিনে ফুল দেওয়ার মতো শোকবহ কর্মসূচি পালন করা হয় যা নদীর বিপন্নতাকে ফুটিয়ে তোলে। এছাড়াও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং নদীবিষয়ক সেমিনারের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ‘রিভার লিটারেসি’ বা নদী-সাক্ষরতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। সংবাদমাধ্যমগুলো এই দিনে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে এবং টকশোতে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সরকারের নদী খনন ও ড্রেজিং প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি তোলা হয়।

সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বাংলাদেশের নদীগুলোর ভয়াবহ সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশে প্রায় ২০,০০০ কিলোমিটার জলপথ হারিয়ে গেছে। উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী বাংলাদেশের সকল নদী এখন ‘জীবন্ত সত্তা’ হলেও, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায় বর্তমানে নদী দখলদারের সংখ্যা প্রায় ৬৩,০০০-এর বেশি। দূষণের চিত্র আরও ভয়াবহ; শুধু বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিদিন প্রায় ২১,০০০ ঘনমিটার শিল্পবর্জ্য নির্গত হয়, যার ফলে নদীর পানির ডিও (Dissolved Oxygen) লেভেল অনেক ক্ষেত্রে ১ মিলিগ্রাম/লিটারের নিচে নেমে আসে, যেখানে মাছ ও জলজ প্রাণীর টিকে থাকার জন্য সর্বনিম্ন ৫ মিলিগ্রাম/লিটার অক্সিজেন প্রয়োজন। এছাড়াও ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির প্রবাহ ৪১% পর্যন্ত কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহও গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা বাংলাদেশের মোট পানিসম্পদের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই পরিসংখ্যানগুলোই প্রমাণ করে যে, ১৪ মার্চের আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা দিবস বাংলাদেশের জন্য কেবল একদিনের উৎসব নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।
বাংলাদেশের 'জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন' (NRCC) কর্তৃক প্রণীত ডিজিটাল ডাটাবেজ এবং নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায় মূলত বাংলাদেশের পরিবেশগত আইনের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তাত্ত্বিকভাবে, ২০১৯ সালে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ 'হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ' বনাম বাংলাদেশ সরকার মামলায় যে রায় প্রদান করেন, তাতে দেশের সকল নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ (Living Entity) বা ‘আইনি ব্যক্তি’ (Legal Person) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই রায়ের ফলে নদী এখন মানুষের মতোই আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী এবং নদীর ক্ষতি করা মানে একজন ব্যক্তিকে আঘাত করার সমান অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই আইনি কাঠামোর অধীনে 'জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন'কে নদীর ‘আইনি অভিভাবক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার ফলে বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে এসে একটি সংবিধিবদ্ধ আইনি অধিকারের রূপ লাভ করেছে, যা বিশ্বের খুব কম দেশেই (যেমন নিউজিল্যান্ডের হোয়াহানু নদী) বিদ্যমান।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ডিজিটাল ডাটাবেজটি এই আইনি লড়াইয়ের একটি প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ভিত্তি। কমিশনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে মোট নদী দখলদারের সংখ্যা ৬৩,২৪৯ জন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশকে উচ্ছেদ করা সম্ভব হলেও পুনরায় দখলের প্রবণতা রয়ে গেছে। এই ডাটাবেজে দেশের প্রায় ১,০০৮টি নদীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে, যার লক্ষ্য হলো প্রতিটি নদীর সীমানা, গতিপথ এবং বর্তমান অবস্থা ডিজিটাল ম্যাপের মাধ্যমে নিশ্চিত করা। পরিসংখ্যানগতভাবে দেখা যায় যে, ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেই নদী দখলের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। কমিশনের তথ্যমতে, কেবল তুরাগ নদীর তীরবর্তী এলাকাতেই কয়েক হাজার অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে, যা উচ্চ আদালতের রায়ের পর উচ্ছেদ অভিযানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়ায়।

আইনি ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, উচ্চ আদালত নদী দখলদারদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার এবং ব্যাংক ঋণ পাওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করার যে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কৃতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে সক্ষম। পরিসংখ্যানে প্রকাশ যে, ইতিপূর্বে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি নদী দখল করে শিল্পকারখানা গড়ে তুললেও এই রায়ের পর তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজতর হয়েছে। নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের নদীবন্দর এলাকায় প্রায় ১৮,০০০-এর বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং উদ্ধারকৃত ভূমির পরিমাণ কয়েক হাজার একর। তবে তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জটি হলো ‘নদী রক্ষা কমিশন’ এখনো পর্যন্ত একটি সুপারিশকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে; তাদের সরাসরি দণ্ড প্রদানের ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে শতভাগ সাফল্য অর্জন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।

সামগ্রিকভাবে, ডিজিটাল ডাটাবেজটি নদীর ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ হিসেবে কাজ করছে যা ভবিষ্যতের যে কোনো অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। উচ্চ আদালতের রায়ে নদীকে ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ হিসেবে ঘোষণা করায় রাষ্ট্র এখন নদীর মালিক নয়, বরং রক্ষক মাত্র। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০৫টি ছোট-বড় নদী বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে এবং এর মধ্যে অন্তত ১০০টি নদী মৃতপ্রায়। এই জটিল পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ডাটাবেজের সঠিক বাস্তবায়ন এবং উচ্চ আদালতের রায়ের পূর্ণ প্রয়োগই পারে বাংলাদেশের এই জীবনরেখাগুলোকে রক্ষা করতে। এই আইনি ও প্রযুক্তিগত সমন্বয় বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-6) অর্জনে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।