তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের চরমাঠলা খেয়াঘাট এলাকায় মধুমতি নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা বালুচর এখন ভ্রমন পিপাসু মানুষের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে। 

মধুমতি নদীতে পানি কমে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিশাল চর জেগে ওঠায় সেখানে সৃষ্টি হয়েছে চিত্ত বিনোদনের স্পর্ট। বিকেল হলেই চরমাঠলা এলাকায় মধুমতিপাড় ও চরে বিভিন্ন বয়সের হাজারো মানুষের ভিড় জমে। এটি এখন বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অনেকে নদীর নীল জলরাশি আর জেগে উঠা ধূসর বালুচরের নাম দিয়েছেন ‘মিনি কক্সবাজার’।

সম্প্রতি বিস্তীর্ণ এ বালুচরের ড্রোন শট ও নয়নাভিরাম ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এরপর থেকেই শুধু গোপালগঞ্জ নয়, পার্শ্ববর্তী নড়াইল, বাগেরহাট, মাগুরা ও ফরিদপুর থেকে ভ্রমন পিপাসুরা এখানে ছুটে আসছেন।

এ চরের অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘জোয়ার-ভাটার’ খেলা। জোয়ারের সময় পুরো চরটি অতল জলরাশিতে তলিয়ে যায়, আবার ভাটা শুরু হতেই বুক চিরে জেগে ওঠে ধবধবে সাদা বালুর এক বিশাল দ্বীপ। প্রায় দুই ঘন্টা থাকে এই চরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

দূর থেকে দেখলে মনে হয়- নদীর মাঝে এক টুকরো সমুদ্র সৈকত। এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করতে প্রতিদিন শহর ও গ্রামের ব্যস্ততা ফেলে হাজারো মানুষ এখানে ভিড় করছেন।

সরেজমিনে চরমাঠলা খেয়াঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পায়ে হেটে আসছেন শত শত মানুষ।
তরুণরা মেতে উঠেছেন বালুচরে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলায়। কেউবা মেতেছেন আড্ডা আর গানে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা মানুষগুলো মেতেছেন সেলফি আর ভিডিও করার উল্লাসে। মাত্র ৫০-১০০ টাকার বিনিময়ে নৌকায় চড়ে পুরো চর এলাকা ঘুরে দেখার সুযোগ মিলছে, এটি ভ্রমন পিাসুদের বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে।

মধুমতির এ চরকে কেন্দ্র করে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি, ভেলপুরি, শিশুদের খেলনার দোকান । সব মিলিয়ে এখানে এখন জমজমাট পরিবেশ। এতে স্থানীয় গ্রামবাসীর সংসারে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নৌকার মালিক ও মাঝিরাও ভ্রমন পিপাসুদের পারাপার করে প্রতিদিন ভালো টাকা আয় করছেন।

এখানে নৌকা ভ্রমণেরও সুযোগ রয়েছে। নৌকা ভ্রমণের জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ২০ থেকে ৫০ টাকা। এতে নৌকার মালিক ও মাঝিরাও পাচ্ছেন বাড়তি আয়। স্বল্প সময়ে গড়ে ওঠা এ চর স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামে চঞ্চল মাহমুদ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন- ‘মেয়ের আবদারে এখানে আসা। স্বচ্ছ জলরাশির মাঝে এমন সুন্দর চর সত্যিই মনমুগ্ধকর। মনে হচ্ছে সমুদ্রের পাড়েই আছি। পরবর্তীতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এখানে আসার ইচ্ছা রয়েছে ।’

গোপালগেঞ্জর জালালাবাদ ইউনিয়নের খালিয়া গ্রামের মাজাহার শেখ, দুর্গাপুর গ্রামের রমেণ মাঝি, মধুমতি বাজারের ব্যবসায়ী ফয়েজ আহম্মেদ বলেন, গোপালগঞ্জ সদরে মানসম্মত বিনোদন স্পর্টের দীর্ঘদিনের। মধুমতি নদীর চরমাঠলার চরের এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে, যদি একটি সুপরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্র বা বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়, তবে এটি জেলার অর্থনীতি ও পর্যটন খাতে মাইলফলক হতে পারে।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কৌশিক আহম্মেদ বলেন, ‘মধুমতি নদীর চরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভ্রমণে আসছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জোয়ার-ভাটার কারণে আকস্মিকভাবে পানির স্তর বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকায় দর্শনার্থীদের সতর্ক থাকতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। দর্শনার্থীরা যেন নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও আনন্দঘন পরিবেশে এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’

(টিবি/এসপি/মার্চ ১৪, ২০২৬)