মানিক লাল ঘোষ


বাঙালির আবেগের মাস ‘অগ্নিঝরা মার্চ’-এ ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলো। যে সংসদ হওয়ার কথা ছিল সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক, সেখানে স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণে যেমন অদ্ভুত নীরবতা দেখা গেছে, তেমনি জাতীয় সত্তার মূলে আঘাত হানার মতো কিছু ঘটনাও পরিলক্ষিত হয়েছে।

অধিবেশনের শুরুতে জাতীয় সংগীত বাজার সময় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্য ও প্রতিনিধিদের মধ্যে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে যে অনীহা ও বিলম্ব দেখা গেছে, তা কেবল শিষ্টাচার বহির্ভূত নয়; বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি প্রকাশ্য অবমাননা। একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্তরসূরিদের এই আচরণ প্রমাণ করে যে, দেশের প্রতি তাদের আনুগত্য আজও প্রশ্নবিদ্ধ। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে জাতীয় সংগীতের এমন অবমাননা দেশপ্রেমিক জনগণের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।

সংসদীয় ঐতিহ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। কিন্তু এবারের অধিবেশনে যে নজিরবিহীন বৈপরীত্য দেখা গেল, তা রীতিমতো স্তম্ভিত করার মতো। যেখানে স্বাধীনতার প্রধান রূপকারকে অবজ্ঞা করা হয়েছে, সেখানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে দণ্ডিত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। এটি কেবল আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর এক চরম কুঠারাঘাত। দণ্ডিত অপরাধীদের প্রতি সংসদের এই বিশেষ ‘প্রীতি’ শহীদের রক্তের সাথে এক নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও একপাক্ষিকতার ছায়া

মূলত, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের অনুপস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন রাজনৈতিক দলকে প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে গঠিত এই সংসদের গ্রহণযোগ্যতা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। জনমতের প্রতিফলন না থাকায় সংসদের কার্যপ্রণালীতে এখন চরম একপাক্ষিকতা ও স্বেচ্ছাচারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইতিহাসকে আড়াল করে বা বিকৃত করে কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে না। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ—এই ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করার যেকোনো অপচেষ্টা মহাকালের কাছে ব্যর্থ হতে বাধ্য।

জাতীয় সংগীতের অবমাননা ও দণ্ডিত অপরাধীদের প্রতি এই তথাকথিত মহানুভবতার বিরুদ্ধে আজ দেশের সচেতন সমাজ ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা প্রকাশ করছে। ত্রয়োদশ সংসদের এই সূচনা যদি ইতিহাসবিস্মৃতি আর পক্ষপাতের মধ্য দিয়ে হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। আমরা আশা করি, সংসদ তার এই বিচ্যুতি সংশোধন করবে এবং জাতীয় বীরদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে একটি সুস্থ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ধারা বজায় রাখবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।