তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার শ্রীধাম ওড়াকান্দিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মহাবারুনীর দু’ দিনের স্নানোৎসব সমাপ্ত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালের দিকে দেশের সর্ববৃহৎ এ স্নানোৎসব সমাপ্ত হয়। এবছর এতে অন্তত ১৫ লাখ পূণ্যার্থী অংশ নিয়েছে বলে ওড়াকান্দি ঠাকুর পরিবারের পক্ষ থেকে ধারণা করা হচ্ছে। 

সোমবার (১৬ মার্চ) সকাল ৮ টা ৩৭ মিনিটে উৎসব মুখর পরিবেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পুণ্যার্থীরা দেড় শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ স্নানোৎসবে অংশ নেন। স্নানোৎসবকে কেন্দ্রকরে ওড়াকান্দিতে ৩ দিন ব্যাপী মহাবারুনীর মেলা চলছে। এ মেলা আগামীকাল বুধবার শেষ হবে।

পুণ্যব্রহ্ম শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ২ শ’ ১৫ তম আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে সোমবার গদীনশীল ঠাকুর ও মতুয়ামাতা শ্রীমতি সীমা দেবী ঠাকুর ও মহামতুয়াচার্য শ্রী পদ্মনাভ ঠাকুর কামনা সারোবরে স্নান করে স্নানোৎসবের শুভ সূচনা করেন। এরপর পাঁচ কুড়ির দল স্নানে অংশ নেয়। তার পর থেকে চলতে থাকে স্নানোৎসবের পালা । মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে স্নানোৎসব।

আজ মঙ্গলবার ব্রহ্মমূহুর্তে (প্রত্যুষে) বাংলাদেশ মতুয়া মহাসংঘের মহাসংঘাদিপতি ও ঠাকুর পরিবারের প্রবীণ সদস্য শ্রীমতি সীমাদেবী ঠাকুরের নেতৃত্বে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও পূজাঅর্চণা করা হয় । পরে তিনি কামনা সারোবরে (বড় পুকুর) স্নান করে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় বিশেষ প্রার্থণায় অংশ নেন।

কাশিয়ানী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও হরিচাঁদ ঠাকুরের ৬ষ্ঠ পুরুষ মতুয়াচার্য শ্রী সুব্রত ঠাকুর জানান, দেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত এলাকা ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা থেকে পুন্যার্থীরা দলে দলে ঢাক, ঢোল, শংখ , কাশি বাজিয়ে লাল নিশান উড়িয়ে হরি বোল ধ্বনিতে এলাকা প্রকম্পিত করে স্নানোৎসবে অংশ গ্রহন করেন। দু’ দিন বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ সহ লাখ লাখ পুন্যার্থীরা পাপ মুক্তি ও পাপ মোচনের আশায় স্নান করেন। স্নান সেরে ভক্তরা ঠাকুরের মন্দিরে প্রনাম করে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও ঠাকুরের কৃপা লাভের জন্য প্রার্থনা করেন। এবছর ১৫ লাখ পূণ্যার্থী স্নানোৎসবে অংশ নিয়েছে বলে তিনি ধারণা করছেন।

ওড়াকান্দিতে সোমবার থেকে ৩ দিন ব্যাপী বারুনীর মেলা শুরু হয়েছে জানিয়ে সুব্রত ঠাকুর বলেন, আগামী কাল বুধবার এ মেলা শেষ হবে।

স্নানোৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি ও শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ষষ্ঠ পুরুষ শ্রী অমিতাভ ঠাকুর বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি মহা তীর্থস্থান। উৎসবের আমেজে স্নানোৎসবে পূণ্যার্থীরা অংশ নিয়েছে। ভাব গাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়েই স্নানোৎসব সম্পন্ন হয়েছে।

বাগেরহাট জেলার হোগলাবুনিয়া গ্রামের নির্মল ওঝা বলেন, এটি বারুনী উৎসবের বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্নানোৎসব ও মেলা। এখানে পূণ্য লাভের আশায় স্নান করেছি। ওড়াকান্দিতে স্নান করলে পাপ মোচন হয় বলে প্রচলিত রয়েছে। এ বিশ্বাস আমাদের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ দেড় শ’ বছর ধরে।

উল্লেখ্য, নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের ত্রাণ কর্তা হিসাবে ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ ফাল্গুন মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে কাশিয়ানী উপজেলার সাফলিডাঙ্গা গ্রামে আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রী-শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর। পাশ্ববর্তী ওড়াকান্দি গ্রাম ঠাকুরের সাধনা ও লীলা ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সেখান থেকে ঠাকুর প্রচার করেন মতুয়া ধর্ম। ঠাকুরের অনুসারীদের বলা হয় মতুয়া। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোটি-কোটি মতুয়ার কাছে ওড়াকান্দি মহাপবিত্র পুণ্যভূমিতে পরিনত হয়েছে। পরবর্তিতে তাঁর ছেলে শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর ওড়াকান্দিতে হরিচাঁদ ঠাকুরের অবির্ভাব তিথি ঘিরে স্নানোৎসব ও মহাবারুণীর মেলার প্রচলন করেন । তারপর থেকে দেশের সর্ববৃহৎ এ স্নানোৎসব ১৫০ বছরের ধরে চলে আসছে।

২০২১ সালের ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওড়াকান্দির ঠাকুর বাড়ি সফর করেন। এদিন তিনি শ্রী-শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। পরে তিনি ঠাকুর পরিবারের সদস্যদের সাথে কুশল বিনিময় করেন ।যোগ দেন মতবিনিময় সভায়।

(টিবি/এসপি/মার্চ ১৭, ২০২৬)