ইমা এলিস, নিউ ইয়র্ক : কানাডার সদ্য পাস হওয়া বিল সি-১২, হাজার হাজার শরণার্থী ও অভিবাসী মানুষকে নির্যাতন, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কানাডার মানবাধিকার সংগঠনগুলো নতুন একটি ফেডারেল আইনকে তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, এটি দেশের শরণার্থী ও অভিবাসীদের অধিকারের ওপর 'গুরুতর আঘাত' হানছে। স্থানেীয় সময় শুক্রবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে দুই ডজনেরও বেশি সংগঠন সতর্ক করে জানায়, তাদের মতে সদ্য পাস হওয়া বিল সি-১২, এই আইন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারকে এমন এক 'বিপজ্জনক পথে' নিয়ে যাচ্ছে। যেখানে কানাডায় আশ্রয় প্রার্থনার সুযোগ সীমিত হবে, ব্যাপক হারে অভিবাসনসংক্রান্ত নথি ও আবেদন বাতিল করা যাবে এবং ব্যক্তিগত তথ্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ভাগ করার সুযোগ বাড়বে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কানাডা, কানাডিয়ান সিভিল লিবার্টিজ অ্যাসোসিয়েশন এবং কানাডিয়ান কাউন্সিল ফর রিফিউজিসহ আরও অনেকে।
বৃহস্পতিবার আইনে পরিণত হওয়া বিল সি-১২ নিয়ে কয়েক মাস ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন অধিকারকর্মীরা। বিশেষ করে, নতুন একটি বিধান অনুযায়ী কেউ যদি কানাডায় প্রবেশের এক বছরের বেশি সময় পরে আশ্রয়ের আবেদন করেন, তবে তিনি স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল কানাডার অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ড-এ পূর্ণাঙ্গ শুনানির সুযোগ পাবেন না।

এর পরিবর্তে আবেদনকারীদের ‘প্রি-রিমুভাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ নামের একটি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে, যা অধিকারকর্মীদের মতে শরণার্থীদের জন্য কম সুরক্ষা প্রদান করে এবং 'সম্পূর্ণভাবে অপর্যাপ্ত'।
আইনটি সরকারকে 'জনস্বার্থে' প্রয়োজন মনে করলে স্থায়ী বা অস্থায়ী ভিসা, কর্ম ও পড়াশোনার অনুমতিসহ বিভিন্ন অভিবাসন নথি বাতিলের ক্ষমতাও দেয়।

অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, 'এই সরকার যুক্তরাষ্ট্রের মতো অভিবাসীবিরোধী মনোভাব ও নীতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।' তবে কানাডা সরকার বলছে, অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবেই এই আইন আনা হয়েছে।

অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্বমন্ত্রী লেনা দিয়াব বলেন, 'বিল সি-১২ পাস হওয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য, কার্যকর ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব উপকরণ শক্তিশালী করছি।'

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, তার পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডো-এর মতোই, কোভিড-১৯ মহামারির পর বেড়ে যাওয়া অস্থায়ী ভিসা বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বিদেশি কর্মীদের জন্য কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় অভিবাসী ও শরণার্থীদের প্রতি জনমতও কিছুটা নেতিবাচক হয়েছে। অধিকারকর্মীদের মতে, আবাসন সংকটসহ বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য অন্যায়ভাবে অভিবাসীদের দায়ী করা হচ্ছে।

সরকারি অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, বিল সি-১২-এর নতুন আশ্রয় যোগ্যতার নিয়ম 'আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাবে, হঠাৎ আবেদন বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলা করবে, ফাঁকফোকর বন্ধ করবে এবং নিয়মিত অভিবাসন প্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে আশ্রয় চাওয়ার প্রবণতা নিরুৎসাহিত করবে।'

এদিকে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি সতর্ক করে বলেছে, বিল সি-১২ “শরণার্থী সুরক্ষা দুর্বল করতে পারে”।

কমিটি আরও বলেছে, 'আন্তর্জাতিক সুরক্ষা প্রার্থীদের জন্য জাতীয় ভূখণ্ডে অবাধ প্রবেশাধিকার এবং ন্যায্য ও কার্যকর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে প্রয়োজনীয় সব আইনি সুরক্ষা থাকবে।'

কানাডায় শরণার্থী অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, তারা এই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। সম্প্রতি মন্ট্রিয়ালে এক সমাবেশে ‘ওয়েলকাম কালেকটিভ’-এর প্রতিনিধি ফ্লাভিয়া লেইভা বলেন, এই আইন মানুষকে আতঙ্কিত করছে।

তিনি বলেন, 'এই বিলটি ভয়ঙ্কর'। মানুষ আমাদের কাছে এসে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করছে ‘আমি কি থাকতে পারব?’

তিনি আরও বলেন, 'মানুষ এখানে কাজ করতে আসে, কঠিন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে আসে। আমরা ভুলে যেতে পারি না শরণার্থীরা এমন মানুষ, যারা অত্যন্ত কঠিন বাস্তবতা থেকে পালিয়ে এসেছে এবং যারা নিজের দেশে ফিরে যেতে পারে না।'

(আইএ/এসপি/মার্চ ২৮, ২০২৬)