দিনাজপুরে জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার
শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর : দিনাজপুরে কাটছেনা জ্বালানি তেল সংকট। হাহাকার পড়ে গেছে জ্বালানি তেলের। জেলার বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের সংকট থাকায় ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও পাম্পে তেল শেষ শুনে ছুটছে আরেক পাম্পে। তেল না পাওয়ায় বিভিন্ন পাম্প এ ছুটাছুটি করতে দেখা গেছে মোটরসাইকেল চালকদের। পেট্রোল অকটেন চালিত যানবাহনগুলোর চালকরা পড়েছে বেশি বিপাকে। তেলের জন্য অনেক জায়গায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। রেশনিং পদ্ধতিতে কোন কোন ফিলিং স্টেশন তেল দিলেও পেট্রোল ও অকটেন না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকসহ সাধারণ মানুষ।
আজ শনিবার ভোর থেকে দিনাজপুর শহর ও শহরতলী এবং পার্শ্ববর্তী উপজেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেন না থাকায় সরবরাহ বন্ধ থাকতে দেখা যায়। এতে বিপাকে পড়েছেন জ্বালানি তেল ব্যবহারকারী যানবাহন চালকরা। তবে দুপুরের পর কোন কোন ফিলিং স্টেশন থেকে ২ লিটার করে তেল দিতে দেখা গেছে।
ভুক্তভোগী চালকরা জানান, ভোর থেকে পাম্পে তেল 1বিক্রি বন্ধ থাকায় তারা তেল নিতে পারছেন না, এতে দূর-দূরান্ত থেকে যারা কআসছেন তাদের বেশি বিপাকে পড়তে হয়েছে।
এদিকে ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে।
পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি হাবিবুর রহমান শাহীন গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, একটি ট্যাংক লরির ধারণক্ষমতা ৯ হাজার লিটার কিন্তু পার্বতীপুর ডিপো থেকে মাত্র তিন হাজার লিটার দেওয়া হচ্ছে। যা পর্যাপ্ত নয়। পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য আহ্বান জানিয়েছেন পেট্রোল পাম্প মালিক গ্রুপ।
দিনাজপুর-পঞ্চগড় আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারের ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের ৪০টি বন্ধ রাখা হয়েছে।
অসংখ্য গ্রাহক তেল কিনতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিরে যাচ্ছেন। তেল সংকটে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কয়েকজন গ্রাহক বলছেন, তেল থাকতেও দিচ্ছে না, দাম বাড়ার অপেক্ষায় মজুত করেছেন পাম্পমালিকেরা। সিন্ডিকেট করে খুচরা পাইকারদের তেল দেওয়া হচ্ছে। ছোট ছোট বাজারে তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়।
দিনাজপুর থেকে বীরগঞ্জ উপজেলা পর্যন্ত ২১টি পাম্পের মধ্যে তিনটিতে শুধু পেট্রল বিক্রি হচ্ছে। সেখানে গ্রাহকদের লম্বা সারি। কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে,কেউ মোটর সাইকেলের টাংকি খুলে হাতে নিয়ে পাম্পে হাজির হয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। গ্রাহকদের ভিড়ে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পের কর্মীরা। সিরিয়াল ভাঙতে দেখলেই শুরু হচ্ছে হইহুল্লোড়, চিৎকার, চেঁচামেচি। এ দৃশ্য শুধু দিনের নয়, ফিলিং স্টেশনগুলোতে রাত-ভোর চোখে পড়ছে। হাহাকার পড়ে গেছে জ্বালানি তেল নিয়ে।
কিছুতেই কাটছেনা জ্বালানি তেলের সংকট। অকটেন ও পেট্রোলের পাশাপাশি এবার ডিজেলের ঘাটতিও প্রকট হয়ে উঠেছে। এতে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিক,মালিক এবং সাধারণ যাত্রীরা।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় এবং ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা যানজোটের কারণে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। দিনাজপুর থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস শ্রমিকরা জানান,আগে যেখানে যাতায়াতে যে সময় লাগতো বর্তমানে অনেক বেশি সময় লাগছে। ঢাকায় যেতে ৯ ঘণ্টা সময় লাগত, বর্তমানে তা বেড়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। এতে সময়ও নষ্ট হচ্ছে, আবার মানসিক চাপও বাড়ছে। যাত্রীরাও ক্ষুব্ধ হচ্ছেন।
দিনাজপুরের অভ্যন্তরীণ রুটেও একই চিত্র দেখা গেছে। দিনাজপুর-হাকিমপুর (হিলি) সড়কে চলাচলকারী চালকরা জানান, প্রায় ৭৫ কিলোমিটার যাতায়াতে যেখানে ৪০ থেকে ৪৫ লিটার তেল প্রয়োজন, সেখানে তারা পাচ্ছেন মাত্র অর্ধেক। বাকি তেলের জন্য বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
যাত্রী মোকাররমের অভিযোগ, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় বসে থাকতে হচ্ছে। কোথাও তেল নেই, আবার কোথাও দীর্ঘ লাইন। আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে, ভোগান্তিও বাড়ছে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত।’
এ অবস্থায় যাত্রীদের সঙ্গে বাস শ্রমিকদের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে। বাস শ্রমিক হুমায়ুন জানান, জ্বালানি সংকট তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দরকার।
জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির সারি এখনও লম্বা। দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোথাও ঝুলছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড। সরবরাহ অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে সংকট আর বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।
(এসএস/এসপি/মার্চ ২৮, ২০২৬)
