মাদক কারবারিদের নিত্যনতুন কৌশলে অসহায় প্রশাসন
হাবিবুর রহমান রুবেল, ঝিনাইদহ : ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা জেলা ঝিনাইদহে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হলেও থামছে না কারবারিদের তৎপরতা। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের কৌশল বদল করে আরো সক্রিয় হয়ে উঠছে। নিত্যনতুন কৌশলে সীমান্তের মাদক সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে কারবারিরা। নতুন নতুন কৌশলে মাদক সরবরাহ ও বিক্রির কারণে অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ছে প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় ৭৬ কিলোমিটার ভারতীয় সীমান্ত রয়েছে। যার মধ্যে ১২ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে কাঁটাতারের বেড়াহীন। অধিকাংশ এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও চোরাচালানে থেমে নেই পাচারকারীরা। বিভিন্ন কৌশলে কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে রাতের আঁধারে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসছে ফেন্সিডিল, উইনকেরেক্স, গাঁজা, ইয়াবা, টাপেন্টাডালসহ নানা ধরণের মাদকদ্রব্য। প্রথমে পাচারকারীরা ভারত থেকে নিয়ে এসে সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামের আস্তানায় রাখে। এরপর সুযোগ মতো ছড়িয়ে দেয় সারা দেশে। সন্ধ্যা হলে সীমান্তের গ্রামগুলোতে বহিরাগত মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। চা পানের দোকানে, বিভিন্ন সড়কের মোড়ে মোড়ে ছদ্মবেশে বিক্রি হচ্ছে মাদক। এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন চিহ্নিত কিছু কারবারি। এদের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদেরও সখ্যতা বেশ।
স্থানীয়রা জানান, মহেশপুর উপজেলার বেশকিছু পয়েন্ট হয়ে উঠেছে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট। যেখান দিয়ে ভারতীয় মাদক ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে। সম্প্রতি সীমান্ত এলাকায় বিজিবি অভিযান বাড়লেও বন্ধ হয়নি মাদক। প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পরেও যেন টিকেই আছে শক্তিশালী মাদক নেটওয়ার্ক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতীয় সীমান্তবর্তী কুসুমপুর এলাকায় মনসুর আলী, পেপুলবাড়িয়া এলাকায় সুমন মিয়া ও রতন মিয়া, শ্যামকুড় এলাকায় কালা বশির ও মমিনুর, লড়াইঘাট এলাকায় শাহজাহান আলী, শ্রীনাথপুর এলাকায় হুকুম আলী ও বাঘাডাঙ্গা এলাকায় মাজেদুল ইসলাম বর্তমানে মাদক চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে। এরা সুযোগ মত বিজিবির কতিপয় অসাধু সদস্যদের যোগসাজশে সীমান্তের ওপার থেকে মাদক এনে মজুত করে। পরে সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তা পাঠিয়ে দেয়।
সূত্র জানায়, ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে দফায় দফায় বিজিবির অভিযান, মালিকবিহীন বিভিন্ন ধরণের মাদকদ্রব্য জব্দ, একের পর এক মামলা করেও কমছে না মাদক। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাতভর অভিযান সবই ব্যর্থ হয়ে পড়ছে প্রভাবশালী মাদক চক্রের কাছে। মহেশপুর উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামগুলো যেন এক অদৃশ্য অন্ধকারে আটকে গেছে।
জেলা সচেতন নাগরকি সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, ‘অনেককে দেখেছি, মাদক ব্যবসা ছেড়ে ভালো হতে প্রশাসনের হাতে ফুল দিয়ে শপথ করেছেন। তারা কিছুদিন ভালো থাকলেও পরে আবারো আগের পেশায় ফিরে গেছেন। আবার অনেকে মাদকের মামলায় কারাগার থেকে বেড়িয়ে পুনরায় দ্বিগুণ গতিতে মাদক করবারে ঝুঁকে পড়ছে। কারণ, মামলা হলে তার খরচ রয়েছে, যার অর্থ যোগান দিতেও অনেকেই পেশা বদল করছেন না। যারা মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হচ্ছেন তারা যেন সাজাভোগ ছাড়া কোনোভাবে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেড়িয়ে না যায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে আইনের যথার্থ প্রয়োগ করতে হবে।’
এসব বিষয়ে জানতে মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল রফিকুল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ মো. হাশেম আলী বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। তবে কারবারিরা যেভাবে কৌশল পরিবর্তন করছে, তাতে প্রতিনিয়ত আমাদের নতুন ভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মাদকের প্রাদুর্ভাব কিছুটা বাড়লেও আমরা নতুন কৌশলে দফায় দফায় অভিযান পরিচালনা করছি। ফলে মাদকের কারবার কিছুটা কমতে শুরু করেছে।’
তিনি বলেন, ‘মাদকের সঙ্গে কোনো আপস নয়। মাদক নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে দিনরাত আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
(এইচআর/এসপি/মার্চ ২৯, ২০২৬)
