অবৈধভাবে ইতালী যাত্রা
লিবিয়ার বন্দিশালায় কালকিনির যুবকের মৃত্যু
মাদারীপুর প্রতিনিধি : অবৈধভাবে ইতালী যাত্রা পথে লিবিয়ায় বন্দিশালায় মাদারীপুরের কালকিনির ইয়িলাস হাওলাদার (৩০) নামের এক যুবক মারা গেছে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাতে নিহতের পরিবার তার মারা যাবার খবর জানতে পারেন। এরপর থেকে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। লাশ দেশে আনার দাবী জানিয়েছেন নিহতের পরিবার।
এর আগে একই দালালের মাধ্যমে ইতালী যাবার পথে ১৮ মার্চ লিবিয়ার বন্দিশালায় নির্যাতনে মারা যান ডাসার উপজেলার বিনতিলুক গ্রামের সেকেন হাওলাদারের ছেলে ফারুক হাওলাদার (৩২)।
খোজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার দক্ষিণ জনারদন্দী গ্রামের কালাম হাওলাদারের ছেলে ইলিয়াস হাওলাদার। প্রায় তিন বছর আগে ইলিয়াস প্রথমে কাতার যান। একই জেলার ডাসার উপজেলার দক্ষিণ গোপালপুর গ্রামের আলমগীর খন্দকারের ছেলে দালাল হাবিব খন্দকারের (৪২) সহযোগিতায় ইলিয়াস ইতালী যাবার স্বপ্ন দেখেন। কাতার থেকে ইলিয়াস ইতালী যাবার জন্য ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে লিবিয়ায় আসেন। সেখানে আসার পর তাকে বন্দিশালায় রেখে পরিবারের কাজ থেকে কয়েক দফায় ২০ লাখ টাকা নেন। টাকা নেয়ার পরও তাকে ইতালী না দিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে। নির্যাতনের এক পর্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তখন তাকে হাসপাতালেও নেয়া হয়নি। পরে ২৩ মার্চ মারা যান ইলিয়াস। এরপর বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাতে দালালের মাধ্যমে ইলিয়াসের মারা যাবার ঘটনা তার পরিবারের কাছে নিশ্চিত করা হয়। এরপর থেকেই পরিবারে চলছে শোকের মাতম। লাশ দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে চান নিহতের পরিবার। এদিকে দালাল হাবিব গোপণে বিষয়টি টাকা দিয়ে মীমাংসার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিহত ইলিয়াস হাওলাদারের বাবা কালাম হাওলাদার বলেন, ছেলে ইতালী যাবে তাই হাবিব দালালের কাছে ২০ লাখ টাকা দিয়েছি। তবুও ওরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। নির্যাতন করেছে, লিবিয়ার গেমঘরে (বন্দিশালা) বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। এখন দালাল হাবিব টাকা পয়সার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। আমি দালাল হাবিবের বিচার চাই। পাশাপাশি আমার ছেলের লাশ দেশে এনে শেষে দেখাটা দেখতে চাই।
এদিকে দালাল হাবিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শতাধিক যুবককে ইতালী নিয়ে যাবার কথা বলে লিবিয়ার বন্দিশালায় আটকে রেখেছেন।
একই গ্রামের আয়নাল, মিথুনসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লিবিয়ার বন্দিশালায় আটকে থাকা যুবকদের পরিবার জানান, ইতালী পাঠানোর জন্য দালাল হাবিব আমাদের কাছে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের সন্তানরা ইতালী যেতে পারেনি। তারা বেশ কয়েক মাস ধরে লিবিয়ার বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। দালালের বিরুদ্ধে কথা বললে আমাদের সন্তানদের আরো বেশি করে নির্যাতন করা হয়। এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তাই আমরা সন্তানের জীবনের কথা চিন্তা করে মামলা দেয়া তো দুরের কথা কোন কথা বা প্রতিবাদও করতে পারছি না।
এর আগে একই দালালের মাধ্যমে ইতালী যাবার পথে ১৮ মার্চ লিবিয়ার বন্দিশালায় নির্যাতনে মারা যান ডাসার উপজেলার বিনতিলুক গ্রামের সেকেন হাওলাদারের ছেলে ফারুক হাওলাদার। গত চার মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়া যান তিনি। সেখানে তাকে বন্দিশালায় আটকে রেখে দালালচক্র ১২ লাখ টাকা নেন।
নিহত ফারুকের মা মালেকা বেগম বলেন, আমার ছেলে গেমঘরে (বন্দিশালা) বসে মারা গেছেন। দালাল বলেছে ছেলের লাশ এনে দিবে। কিন্তু এখনও লাশ এনে দেইনি। আমি আমার ছেলেটাকে শেষবারে মতো দেখতে চাই।
এসব ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা থাকায় অভিযুক্ত দালাল হাবিব খন্দকার গা ঢাকা দিয়েছেন। তাই তার গ্রামের বাড়িতে তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার মোবাইল নাম্বারটিও বন্ধ পাওয়া গেছে। তাই তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহিরুল আলম বলেন, লিবিয়ার গেমঘরে নিহত ইলিয়াস হাওলাদারের বাড়িতে খবর নেয়া হচ্ছে। তবে দালালের বিরুদ্ধে মামলা দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
(এএসএ/এসপি/মার্চ ২৯, ২০২৬)
