গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : হামের উপসর্গ নিয়ে ১০ মাসের শিশু কন্যা তুবা ইসলাম তোহার মৃত্যু নিয়ে গোপালগঞ্জের সিভিলসার্জন একটি কমিটি গঠন করেছেন। আজ সোমবার মুকসুদপুরের কর্মরত চিকিৎসকদের সমন্বয়ে তিনি এ টিম গঠন করেছেন।

সিভিল সার্জন ডা. আবু সাঈদ মোহাম্মদ ফারুক এ তথ্য জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, কমিটির সদস্যরা মঙ্গলবার ওই এলাকায় যাবে, এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করবে। এছাড়া সাসপেক্ট কেস থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে। আমার সম্মেলন কক্ষে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল সহ জেলার সব সরকারি হাসপতালের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সমন্বয়ে সভা করেছি। এ সভায় জেলার সব হাসপাতালে নীবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসকদের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের জ্বরে আক্রান্তদের পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সিভিল সার্জন বলেন, গোপালগঞ্জের কোন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি নেই। জ্বর নিয়ে কিছু শিশু ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে হামের কোন উপসর্গ নেই। গোপালগঞ্জের হাম পরিস্তিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। এখানে হাম সহ সব ধরণের রোগের ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।

গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার টেংরাখোলা ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গা গ্রামের তুহিন শেখের তৃতীয় সন্তান ১০ মাসের ফুটফুটে হাসিখুশি তুবা ইসলাম তোহা গত ২৭ মার্চ হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকায় মারা যায়।

তোহার মা নাজমা বেগম বলেন, হঠাৎ গত ১৯ মার্চ তার তুবার জ্বরে আক্রান্ত হয়। পরের দিন ২০ মার্চ জ্বরের সাথে হালকা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তাকে মুকসুদপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যাই। জরুরী বিভাগের চিকিৎসক সুমন সাহা তাকে চিকিৎসা দেন। কিন্তু তাতে কোন পরিবর্তন হয়নি। ২৪ মার্চ আমার দিনমজুর স্বামী তুহিন শেখ মেয়েকে স্থানীয় সেবা ডিজিটাল ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. কামাল হোসেনের কাছে নিয়ে যান। তিনিও বিভিন্ন প্রকার ওষুধ লেখে ব্যবস্থাপত্র দেন। কিন্তু তাতেও কোন ফল আসেনি। বরং শিশুটির জ্বর, শ্বাসকষ্ট আরো বেড়ে সারা শরীরের হাম দেখা দেয়।

নাজমা বলেন, ২৬ মার্চ সকাল ৯ টার দিকে প্রচন্ড অসুস্থ অবস্থায় আবার তাকে মুকসুদপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা হাসপাতালের জরুরী বিভাগের নিয়ে যাই। ডাঃ মিজানুর রহমান মেয়ের অবস্থা খারাপ দেখে তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেন। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেন এবং কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করান । পরে ওই রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে রেফার করেন।

শিশুটির মা নাজমা বেগম আরো বলেন, আমরা সরকারি হাসপাতালের সেবায় অসন্তুষ্ট ছিলাম। এ কারণে মেয়েকে এক আত্নীয়ের মাধ্যমে ঢাকার মালিবাগে বিএনকে লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করি। ওখানকার চিকিৎসক আমার বাচ্চাকে আইসিইউ সাপোর্ট ও চিকিৎসা দেন। তখন কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। কিন্তু গত ২৭ মার্চ দুপুর ১২ টায় আমার কোলের মধ্যে আমার আদরের ধন নিস্তেজ হয়ে হা-পা ছেড়ে দেয়।তখন আমি চিৎকার দিলে ওখানকার চিকিৎসকরা নানা ভাবে চেষ্টা করেন, কিন্তু সব চেষ্টা বিফলে যায়।

ওই শিশুর পিতা তুহিন শেখ বলেন, আমি আমার শিশু সন্তানকে নিয়ে মুকসুদপুর হাসপাতাল, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও ঢাকায় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়েছি। কিন্তু কোন চিকিৎসায়ই কাজ হলো না। আমার সোনার টুকরা আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) স্থানীয় মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে আমার তোহার দাফন হয়। ববিবার (২৯ মার্চ)বাদ আসর ওর জন্য মিলাদ ও দোয়া হয়েছে । আল্লাহ যেন ওকে জান্নাতবাসী করেন।

টেংরাখোলা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী খোরশেদা মল্লিক ডলি বলেন, জন্মের পর থেকে শিশুটিকে রুটিন মাফিক টিকা দেয়া হয়। গত ২৫ মার্চ শিশুটিকে হামের টিকা দেওয়ার জন্য আমি তুহিন শেখের বাড়িতে যাই । তখন তুহিন শেখের স্ত্রী নাজমা বেগম জানান,তার বাচ্চা অসুস্থ। তাই আমি হামের টিকা না দিয়ে বলে আসি ২৫ এপ্রিল আবার টিকা দিতে আসব। পরে জানতে পারি শিশুটি মারা গেছে।

মুকসুদপুর ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ রায়হান ইসলাম শোভন বলেন, স্বজনরা শিশুটিকে জ্বরের সাথে শ্বাসকষ্ট ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতলের জরুরী বিভাগে ২০ ও ২৬ মার্চ চিকিৎসা নিতে আনেন । ২৬ মার্চ শিশুটির অবস্থা সংকটপন্ন হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেলে পাঠানো হয়। শুনেছি সেখান থেকে ঢাকা পাঠানো হয় এবং ২৭ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ডিজি অফিস থেকে শিশুটির মৃত্যুর তথ্য চাওয়া হয়েছে। আমরা যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে পাঠিয়েছি। ডিজি অফিস পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আমাদের অবহিত করলে সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নেব। তবে গত ৩ বছরের আমরা এখানে হামের কোন পজিটিভ রোগী পায়নি। হাম ছোয়াচে রোগ হলেও আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। তবে আমি মনে করি শিশুটির মৃত্যুর কারণটা আমাদের জন্য জানা খুবই প্রয়োজন। সেজন্য সিভিলসার্জন কমিটি করে দিয়েছে। মঙ্গলবার থেকে কমিটি কাজ শুরু করবে।

(টিবি/এসপি/মার্চ ৩০, ২০২৬)