আবদুল হামিদ মাহবুব


কোথাও কোনো খুঁত পেলেই আমি সমালোচনা করি। সেই খুঁত সারিয়ে ফেললে বা সংশোধিত করা হলে, তার জন্য কি প্রশংসা করবো না? অবশ্যই প্রশংসা করবো। প্রশংসাযোগ্য কাজ করলে সকলেরই প্রশংসা করা উচিত।

এই দুই সাপ্তাহ আগে আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। পোস্টটি ছিলো এমন; 'বাসা থেকে বের হলে রাস্তায় হেঁটে চলারই চেষ্টা করি। হেঁটে হেঁটে গেলে কত কিছু চোখে পড়ে। আজ যাচ্ছিলাম মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের পাশ দিয়ে। কলেজের সীমানা ঘেঁষে যে ড্রেন আছে তার উপরের স্ল্যাবই হচ্ছে ফুটপাত। এই ফুটপাত দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী এবং কলেজের শিক্ষকরাও আসা-যাওয়া করেন। কিন্তু ড্রেনের উপরের দুটি জায়গারই স্ল্যাব ড্রেনে পড়ে পানি চলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করছে। চেয়ে দেখলাম ওই দুই স্থানে অনেক পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল জমে আছে। আমার শক্তিতে কুলায়নি বলে স্ল্যাব উঠাতে পারলাম না। ছোট সময়ে যখন শিশু সংগঠন করতাম তখন এরকম কত স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ আমরা করেছি। পুকুরের কচুরিপানা পরিষ্কার করা, রাস্তার পাশে জংলা আবর্জনাও পরিষ্কার করেছি। স্ল্যাব ওঠাতে সহায়তার জন্য এক দুজনকে ডেকেছিলাম, তাদের হাত নষ্ট হবে তাই এগিয়ে আসেনি। অবশ্য পরিচিত কেউ পেলে নিশ্চয়ই আসতো। স্ল্যাব দুটি উঠিয়ে যথাযথভাবে বসানোর জন্য মৌলভীবাজার পৌরসভা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। নতুবা এখানে তো ময়লা আবর্জনা জমে পানি উপচে রাস্তায় যাবেই; পাশাপাশি বেখেয়ালে কারো পা পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।'

ছোট্ট সেই পোস্টটি নিয়ে একাধিক পত্রিকায় সচিত্র সংবাদও প্রকাশ হয়েছিল। বিষয়টি বেশ আলোচনার খোরাক হয়েছিলো। গতকাল (৩০ মার্চ) আবার সেই ড্রেনের উপর দিয়ে হেঁটে গেলাম। কোথা থেকে ছবি দুটো ( সেই পোস্টের সাথে দেওয়া) উঠেয়েছিলাম, সেই জায়গাই খুঁজে পেলাম না। অর্থাৎ ঠিক জায়গাতে স্ল্যাবগুলো বসিয়ে দেওয়ার কারণে আমি আর সেই খুঁত খুঁজে পাইনি। নিশ্চয়ই পৌর কর্তৃপক্ষের নজরে পড়েছিল। সে কারণে বিষয়টা সংশোধিত হয়ে গেছে। এজন্য আমি পৌরসভার প্রশংসা করছি। তাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তবে আমরা নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে। কিন্তু গতকাল যেটা আমাকে পীড়া দিয়েছে সেটা হচ্ছে গোরুর গোবর। যে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, কয়েকটি স্থানে দেখলাম গোরুর টাটকা গোবর পড়ে আছে। নিশ্চয়ই কোন নাগরিক এই পথ দিয়ে তার গোরু হাঁটিয়ে নিয়েছেন। সেই গোরু তার মল ফেলে ফেলে গিয়েছে।

আমার সামনেই দুইজন কলেজ ছাত্রী গল্প করতে করতে হেঁটে যাওয়ার কালে গোবরে তাদের পায়ের স্যান্ডেল নষ্ট হল। তারা এখানে ওখানে পা মুছে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছে। আমি তাদের বললাম, দ্রুত কলেজে গিয়ে পা আর স্যান্ডেলগুলো ধুয়ে নিতে। আমার কথা শুনে তারা খানিকটা লজ্জাই পেলো।

আরেকটু এগিয়ে দেখি আমাদের শহরের প্রাচীন বিদ্যাপিঠ 'কাশীনাথ আলাউদ্দিন হাইস্কুল এন্ড কলেজ'র সামনে প্রধান সড়কের অনেক স্থানে গোবর লেপ্টে আছে। কিছু সময় দাঁড়িয়ে ওই দিকে তাকিয়ে থাকলাম। অবিরাম গাড়ি রিকশা যাচ্ছে। সেগুলোর চাকা এই গোবরের লেপটানো আরো বাড়াচ্ছে। তার উল্টোদিকে মৌলভীবাজার ক্লাবের সামনের ফুটপাতেও অনেক স্থানে গোবর দেখলাম। এগুলো আমাদের নাগরিক অসচেতনার কারণে।

আমরা যারা পৌর এলাকায় বসবাস করি তাদেরও দায়িত্ব নিয়ে, এই ছোট বিষয়গুলো চিন্তায় রাখতে হবে। কেউ যদি তার গবাদি পশু রাস্তা দিয়ে নিয়ে যান, সেই পশু মাল ত্যাগ করলে নিজ দায়িত্বে সেটা পরিষ্কার করে দিতে হবে। আমাদের এমন মানসিকতা গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন।

আমি কেবল আমার শহর মৌলভীবাজারের নাগরিকদের কথা বলবো না; সারাদেশের সকল শহরের নাগরিকদের এমন মানসিকতা গড়ে উঠতে হবে। তবেই আমাদের শহরগুলো সুন্দর রাখা, পরিচ্ছন্ন রাখা, সম্ভব হবে।

প্রায় দেড় বছর আগে কয়েকদিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখেছি অনেকেই সাথে কুকুর নিয়ে তারা হাঁটছেন। অনেক কুকুর রাস্তার পাশে মল ত্যাগ করছে। কুকুরের মালিক সাথে সাথে তার কাছে থাকা গ্লাভস হাতে লাগিয়ে সেই মলটা উঠিয়ে একটা পলিথিনের ব্যাগে ভরে নিচ্ছেন। আমার বউমাকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, এই মলের প্যাকেটটা তারা নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলবেন। তারা কুকুরের মল প্যাকেটে নিয়ে যাচ্ছে! আর আমরা গোরুর মল কি নিজেরা পরিষ্কার করে দিতে পারি না?

অবশ্যই পারব। কেবল মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। নিজের কাজ দশজনের সামনে নিজে যদি করে ফেলি, এতে একটুও সম্মানহানি হবে না। বরঞ্চ অন্যরা উদ্বুদ্ধ হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।