শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর : দিনাজপুরে বীরগঞ্জে একটি সেতুর কারণে ১০ গ্রামের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় মাহানপুর সড়কে পুনর্ভবা নদীর সেতু ভেঙে যাওয়ার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও পূননির্মিত না হওয়ায় চরম বিপাকে এই ১০ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। নদীর দু'পাশ এলাকার অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। 

বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নের সিংড়া ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মাহানপুরে পূণর্ভবা নদীর উপর গত ২০১৬ সালে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মিত হলেও পরের বছর (২০১৭ সাল) ভয়াবহ বন্যায় নদীর তীব্র স্রোতে সেতুর দুই পাশের মাটি ধসে পড়ে এবং এক পর্যায়ে পুরো কাঠামোটি ভেঙে যায়। এরপর থেকেই যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেতুর দুই পাশে পাকা রাস্তা থাকলেও মাঝখানে ভাঙা অংশের কারণে চলাচল করতে পারছেনা কোনো ধরনের যানবাহন।

স্থানীয়রা জানান, শুষ্ক মৌসুমে কিছু মোটরসাইকেল চালক ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করলেও বর্ষা এলেই পুরো এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সেতুটি চালু থাকলে উপজেলা শহরে যেতে যেখানে লাগত অল্প সময়, এখন সেখানে মানুষকে বিকল্প পথে ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে সময়, অর্থ দুইয়েরই অপচয় হচ্ছে।

কৃষকদের জন্য এই ভাঙা সেতু সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকাটি সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত হলেও সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত কাঁচা সবজি ও পণ্য বাজারজাত করতে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হচ্ছে চাষিদের। এতে লাভের বদলে গুনতে হচ্ছে অনেক সময় লোকসান।

শিক্ষার্থীরাও এই সমস্যার বাইরে নয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ে যাওয়া অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অনেক শিক্ষার্থীকে কয়েক কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়।আবার অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা সেতুর পাশ দিয়ে পারাপারের চেষ্টা করে। ফলে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

মাহানপুর এলাকার বাসিন্দা মজিবর, খলিল,রমাকান্ত, অনিল কুমার,সোহাগসহ অনেকে জানান, সেতুটি চালু হলে অন্তত ১০ কিলোমিটার পথ কমে যেত এবং জীবনযাত্রা অনেক সহজ হতো।

কৃষক শামসুদ্দিন সমু মিয়া জানান, উৎপাদিত সবজি বাজারে নিতে এখন দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে, এতে লাভ কমে যাচ্ছে।

এলাকাবাসীর মতে, এই অবস্থা চলতে থাকলে কৃষিকাজে আগ্রহও কমে যেতে পারে। শিক্ষার্থী সাদিয়া বেগম জানান, বর্ষাকালে স্কুলে যাওয়া সবচেয়ে কষ্টকর হয়ে পড়ে। অনেক সময় ভেজা কাপড়েই ক্লাস করতে হয় কিংবা অনেকে ঝুঁকি এড়াতে স্কুলেই যেতে পারে না।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোপাল দেবশর্মা জানান, একটি ছোট সেতুর অভাবে পুরো এলাকার উন্নয়ন বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

এ বিষয়ে বীরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনদূর্ভোগের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, 'সড়কটি ইতোমধ্যে উন্নয়ন করা হয়েছে এবং ভাঙা সেতুটিও পরিদর্শন করা হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় সেতুটি নতুনভাবে নির্মাণের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে অতিদ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।'

দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম জানান, বীরগঞ্জ উপজেলার সিংড়া-মাহানপুর সড়কের পুনর্ভবা নদীর ওপর ভেঙে যাওয়া সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এলাকার কৃষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ৯ বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু পুননির্মাণ না করে হাজার হাজার মানুষকে চরম বিপাকে ফেলা হয়েছে। সবাই উন্নয়নের কথা বলে।কিন্তু যেখানে উন্নয়নের প্রয়োজন, সেখানে উন্নয়ন হয়না। সেতুটি এতোদিন এভাবে রাখার কতটা যৌক্তিক আছে ?

সচেতন মহল বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই অবহেলা শুধু দুর্ভোগই বাড়াবে না, বরং এলাকার সামগ্রিক অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

(এসএস/এসপি/এপ্রিল ০১, ২০২৬)