স্টাফ রিপোর্টার : সোনা বিক্রির ওপর বর্তমানে নির্ধারিত ১ শতাংশ ন্যূনতম কর বা টার্নওভার কর কমিয়ে ০.২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলারি অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। পাশাপাশি উৎসে কর প্রত্যাহার ও হীরা আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এসব প্রস্তাবনা দেয় সংগঠনটি।

ন্যূনতম কর কমানোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যায় সংগঠনটি জানায়, জুয়েলারি ব্যবসা উচ্চ বিনিয়োগ নির্ভর হলেও মুনাফা ভগ্ন। যাবতীয় ব্যয় বাদ দিলে নিট মুনাফা ১ শতাংশেরও নিচে নেমে যায়। সে হিসাবে ব্যবসায়ীকে তার অর্জিত মুনাফার চেয়ে বেশি অর্থ কর দিতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে মূলধন ভেঙে কর পরিশোধ করতে হয়। এতে ব্যবসার কার্যকর খরচ অনেক বেড়ে যায়। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

এছাড়া সংগঠনটি মসৃণ ও অমসৃণ হীরা আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করেছে। তারা জানায়, হীরা কাটিং এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্দেশে যথাযথ কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানিকৃত অমসৃণ হীরার শুল্ক কমালে দেশে ডায়মন্ড শিল্প বিকশিত হবে।

বাজুস জানায়, এদেশের হীরার চাহিদার শতকরা ১০০ ভাগই বিদেশ থেকে আসে। ফলে প্রচুর দেশীয় মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। শুল্ক-কর সহনীয় পর্যায়ে নির্ধারণ করা হলে বৈধপথে আমদানি উৎসাহিত হবে। ৪০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাডিশন শর্তটি দেশীয় কারিগরদের কর্মসংস্থান বাড়াবে।

এছাড়া স্থানীয় বাজারে পণ্য সরবরাহের সময় মোট বিলের ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর দিতে হয়। এতে ব্যবসার মূলধন ক্ষয় হওয়ায় এই উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে বাজুস। স্বর্ণমেলার আয়োজন ও অঘোষিত সম্পদের জন্য কিছু কর দিয়ে সাধারণ ক্ষমার বিধান রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে অলস মূলধনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি করের আওতা সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে বলে মনে করে সংগঠনটি।

এছাড়া ব্যাগেজ রুলসে বর্তমানে একজন যাত্রী বছরে সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বা ২০০ গ্রাম রুপার অলংকার শুল্কমুক্ত আমদানি করতে পারেন। এছাড়া প্রতি ভরিতে পাঁচ হাজার টাকা শুল্ক দিয়ে ১১৭ গ্রাম স্বর্ণবার আনতে পারেন।

তবে বাজুস বলছে, এতে আমদানিকারকের সংখ্যা সীমিত হচ্ছে ও বাজারে স্বর্ণের কাঁচামালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সাময়িকভাবে আগের বিধান বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে অমসৃণ হীরা আমদানিতে ২ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক, ৫ শতাংশ আট ৩৩ শতাংশ অগ্রিম অ্য্যাকর ও মসৃণ হীরা আমদানিতে ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক, ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি, ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ৭ শতাংশ ভ্যাট ৩৫ শতাংশ অগ্রিম আয়করের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে জুয়েলারি সামগ্রী বিক্রির ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। তবে এখানে স্বর্ণালংকার বিক্রিতে প্রতি ভরিতে দুই হাজার ও প্রতি ক্যারট ডায়মন্ডে দুই হাজার টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাটের প্রস্তাব দিয়েয়ছে বাজুস। এতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করে সংগঠনটি। একই সঙ্গে খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ উৎসে ভ্যাট বহাল আছে। তবে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাজুস।

এছাড়া সংগঠনটি মূসক ফর্ম ৬.২১ সহজ করার প্রস্তাব করেছে। তারা বলছে এর ফলে হিসাব জটিলতা কমবে।

বাজুস স্বর্ণমেলার আয়োজন ও অঘোষিত সম্পদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব বহুগুনে বৃদ্ধি ও কর জাল বাড়বে। এই প্রস্তাবের পক্ষে বলা হয়, স্বর্ণ নীতিমালা ২০১৮ প্রণয়নের পূর্বে বৈধ আমদানি চ্যানেলের দীর্ঘস্থায়ী অভাবের কারণে বাংলাদেশের জুয়েলারি শিল্পটি।

প্রস্তাবে বলা হয়, জুয়েলারি শিল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বহুগুণে বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি ‘স্বর্ণমেলা’ আয়োজন করা উচিত; যা অঘোষিত স্বর্ণ, হীরা ও রৌপ্য (রুপা) বৈধ করার জন্য এককালীন সাধারণ ক্ষমা প্রদান করবে, যা বর্তমানে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ।

অতীতে এ ধরনের উদ্যোগের অভাবনীয় সাফল্যের নজির রয়েছে জানিয়ে বাজুজ বলছে, ২০১৯ সালের ২৩ মে জারিকৃত এসআরও ১৩২-এর অধীনে সরকার যখন অঘোষিত স্বর্ণ বৈধ করার সুযোগ দিয়েছিল, তখন তিনদিনব্যাপী আয়োজিত ‘স্বর্ণমেলা’য় ব্যবসায়ীরা বিপুল উৎসাহে অংশ নিয়েছিলেন।

সেই মেলা থেকে সরকার রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই সফল মডেলটি পুনরায় প্রয়োগ করা হলে তা বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারের রাজস্ব আহরণে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণিত হবে মনে করে সংগঠনটি।

বাজুসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, পণ্যের মূল্য প্রদর্শনের সময় ভ্যাট আলাদাভাবে যোগ করা হয়। বিল করার সময় অতিরিক্ত ভ্যাট যুক্ত হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ক্রেতাদের অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাট এড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। এ কারণে ভ্যাট হার যৌক্তিকীকরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ডায়মন্ড আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে ডায়মন্ড প্রসেসিং শিল্প গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। এসব বিষয়ে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।

(ওএস/এএস/এপ্রিল ০২, ২০২৬)