গোপালগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ২০ রোগী
তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ২০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোররা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হঠাৎ করেই হাম উপসর্গের রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শনিবার (৪ এপ্রিল) সকাল ৯ টা থেকে আজ রবিবার সকাল ৯ টা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ২০ রোগী ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে গোপালগঞ্জ সদরে ৫ জন, কোটালীপাড়ায় ৯ জন, কাশিয়ানীতে ২ জন, টুঙ্গিপাড়ায় ১ জন ও মুকসুদপুর উপজেলায় ৩ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে।
রবিবার পর্যন্ত গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৪৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ শিশু।
গোপালগঞ্জের সিভিলসার্জন ডা. আবু সাইদ মো: ফারুক জানিয়েছেন, চলতি বছর হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ এপ্রিল সকাল ৯ টা পর্যন্ত ১১৩ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে ৩০ জনের নমুনা সংগ্রহ ঢাকা পাঠানো হয়েছে। ঢাকা থেকে প্রাপ্ত রির্পোটে মুকসুদপুর উপজেলার ৬ মাস ও ৭ মাস বয়সী ২ শিশুর শরীরে হাম সনাক্ত হয়। তিনি ২ শিশুর বাড়িতে পরিদর্শন করেছেন। তাদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তারা সুস্থ আছে বলে সিভিলসার্জন জানিয়েছেন। এছাড়া হামের উপসর্গে আক্রান্ত ৬৫ জন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, নতুন রোগী সংখ্যা বাড়লেও এ বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনক নয়। অন্য জেলা গুলোর তুলনায় গোপালগঞ্জে হাম সংক্রামণের হার কম। আমাদের ভ্যক্সিনেসন কর্মসূচি শুরু হয়নি। তবে আমাদের সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা আছে। মুকসুদপুরের আক্রান্ত এলাকায় আমরা দ্রুত ভ্যাক্সিনেশন শুরু করবো। আমরা আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে কাজ করছি। আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা আছে। তবে এ সময় প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার পাশাপাশি জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন এ কর্মকর্তা।
গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, হাম ছোঁয়াচে রোগ। তাই হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীদের সাধারণ রোগী থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। তাদের জন্য হাসপাতালে পৃথক ৪০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।
এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গ দেখা দেয়ার সাথে সাথে রোগীকে সুস্থ মানুষদের থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। আক্রান্তদের প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, ডাবের পানি এবং পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে। সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব রয়েছে।’
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ডালনিয়া গ্রামের আক্রান্ত ১০ মাসের শিশু মোসায়েদ সিকদারের বাবা মামুন সিকদার বলেন প্রথমে প্রচণ্ড জ্বর, দেখা দেয়। পরে গ্রামের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। তারা চিকিৎসা দেয়, কিন্তু তাকে কোন কাজ হয়। শরীরে লালচে র্যাস ওঠে। ৩১ মার্চ প্রথম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে আড়াইশ’ বেড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। এখন অবস্থা ভাল। আগে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। ১০ মাস বয়স হলে হামের টিকা দিতে হয়। হামের টিকা দেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর সাথে সাথে হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান মামুন।
১০ মাসের শিশু মোস্তাকিমের নানী বিলকিস বেগম বলেন, প্রথমে শরীরে তীব্র জ্বর তারপর সর্দি ও কাশির মাধ্যমে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় । এর কয়েক দিন পর সারা শরীরে লালচে গুটি দেখা দেয়।
সদর হাসপাতালে ভর্তি ১ বছরের শিশু আমিরুলের মা তানিয়া বেগম বলেন, ‘প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করেছিলাম, কিন্তু শরীরে দানা ওঠার পর আতঙ্কিত হয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখন তাকে আলাদা ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।’
আইসোলেশন অর্ডের ইনচার্জ সিনিওর স্টাফ নার্স বিউটি হালদার বলেন, বর্তমানে আমাদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গেছে। আগে বছরে হাতে গোনা কয়েকজন, দুই থেকে আটজনের মতো হামের রোগী আসত। কিন্তু এখন হঠাৎ করে প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় গত কয়েকদিন ধরে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আজকেই সকাল পর্যন্ত ছয়জন রোগী এসেছে, যার মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক।
এই হঠাৎ রোগী বৃদ্ধির কারণে আমাদের কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ, আইসোলেশন ওয়ার্ডটি আগে থেকেই থাকলেও এটি মূলত করোনা-পরবর্তী একটি প্রজেক্টের অংশ হিসেবে তৈরি হয়েছিল। হামের মতো এই ধরনের আউটব্রেক মোকাবেলার জন্য আমাদের সেইভাবে প্রস্তুতি বা পর্যাপ্ত ইনস্ট্রুমেন্ট সেটআপ আগে ছিল না।
বর্তমানে আমরা দ্রুত সেটআপ করার চেষ্টা করছি এবং সীমিত সরঞ্জাম ও জনবল নিয়েই যতজন সম্ভব রোগীকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ করে অনেক রোগী একসাথে আসায় কাজের চাপ বেড়ে গেছে, তবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে—যে কোনো পরিস্থিতিতেই রোগীরা যেন প্রয়োজনীয় সেবা পায়।
(টিবি/এসপি/এপ্রিল ০৫, ২০২৬)
