তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : রাস্তার ধারে নিরবে দাঁড়িয়ে আছে নিশান মন্ডল (৭) ও সৃজন মন্ডল (৫)। ছোট্ট দু’টি চোখে একরাশ অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার দীর্ঘ ছায়া। তারা অপেক্ষা করছে তাদের বাবা মিলন মন্ডলের (৩৭) জন্য। মা স্বপ্না মন্ডলের (২৬) আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় গ্রেপ্তারের পর বাবা মিলন রবিবার (৫ এপ্রিল) থেকে কারাগারে রয়েছেন। এ কোমল বয়সে বাবাহীনতার শূন্যতা যেন তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। আশেপাশের মানুষজন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু সেই সান্ত্বনা তাদের হৃদয়ের গভীর কষ্টকে লাঘব করতে পারছে না। মিলন মন্ডল দিন মজুরের কাজ করেন। তারা ৩ ভাই। তার বাবা নিরোধ মন্ডলের বেঁচে আছেন। মা মারা গেছেন।

মিলনকে গ্রেপ্তারের পর থেকে তাঁর বাবা ও দুই ভাই পলাতক রয়েছে। তাদের বাড়িতে কেউ নেই। তাই মিলনের দুই ছেলে পাশের এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এখন তাদের প্রতিপালন করারও তেমন কেউ নেই। অসহায় এ দুই শিশুর শুধু একটাই জিঞ্জাসা —বাবা কখন ফিরবে?

শনিবার (৪ এপ্রিল) গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সিংগা পশ্চিমপাড়া গ্রামে স্বামী মিলন মন্ডলের বাড়ি থেকে স্ত্রী স্বপ্না বাড়ৈর (২৬) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বপ্না বাড়ৈর বাবা পরেশ বাড়ৈ কাশিয়ানী থানায় আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা করেন জামাতা মিলন মন্ডলের বিরুদ্ধে।

পুলিশ শনিবার মিলনকে গ্রেফতার করে। পরের দিন রোববার আদালতের মধ্যমে তাকে গোপালগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠায় । মিলন মন্ডল পেশায় দিনমজুর। তাঁরা ৩ ভাই। বাবা বেঁচে আছেন, মা মারা গেছেন।

আত্মহত্যা প্ররোচনায় অভিযোগ ও গ্রামবাসী সূত্রে জানাগেছে , ৯ বছর আগে কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ি ইউনিয়নের কুমুরিয়া গ্রামের পরেশ বাড়ৈর মেয়ে স্বপ্না বাড়ৈর সাথে সিঙ্গা গ্রামের নিরোধ মন্ডলের ছেলে মিলন মন্ডলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাদের সংসার সুখে শান্তিতে চলছিল। এক পর্যায়ে স্বপ্না বাড়ৈ মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। তাকে প্রথমে খুলনা পরে এলাকাবাসীর আর্থিক সহযোগিতায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। এরই মাঝে তাদের ঘরে দুই সন্তানের জন্ম হয়। মিলন মন্ডল আর্থিকভাবে অসচ্চল। ৩ মাস স্ত্রীর চিকিৎসা ও নিয়মিত ওষুধের যোগান দিতে পারেননি। এতে স্বপ্না আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। শুক্রবার দিবাগত রাতে ছেলে দুটিকে ঘরে রেখে ঘরের আড়ার সঙ্গে নিজের কাপড় গলায় পেচিয়ে আত্মহত্যা করে।

স্বপ্নার বাবা পরেশ বাড়ৈ বলেন, আমার মেয়েকে মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে করে আসছিলো। এ কারণে সে আত্মহত্যা করেছে। আমার মেয়ের কাছে জানতে পেরেছি জামাই মিলন মন্ডলের সাথে এক নারীর বিবাহবর্হিভূত সম্পর্ক রয়েছে। এটি আমার মেয়ে সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা পথ বেছে নিয়েছে।

প্রতিবেশী জানকি মণ্ডল ও উৎসব মন্ডল বলেন, বিয়ের দুই বছর পর থেকে স্বপ্না বাড়ৈ মানসিক সমস্যা আমাদের নজরে আসে। তার আচার আচরণ ও চলাফেরায় অস্বাভাবিক দেখে এলাকারবাসীর কাছ থেকে টাকা তুলে পাবনায় চিকিৎসা করিয়েছি। সেখান থেকে আসার পর কিছুদিন ভালো ছিল। এরপর থেকে আবারো একই আচরণ শুরু করে। স্বপ্না আত্মহত্যার পর তার স্বামী জেলে রযেছে। গ্রেফতার আতংকে শ্বশুর নিরোধ মন্ডল, ভাসুর ও দেবর পলাতক রয়েছে। তাদের বাড়িতে কেউ নেই। স্বপ্না ও মিলন দম্পত্তির ২ ছেলে অসহায় হয়ে পড়েছে। তারা প্রতিবেশির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের কথা বিবেচনা করে মিলনকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

কাশিয়ানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, নিহতের বাবা আত্মহত্যা প্ররোচনাদায় একটা মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় মিলন মন্ডলকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারগারে পাঠানো হয়েছে। গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি। তদন্ত শেষে মিলন দোষী সাব্যস্ত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(টিবি/এসপি/এপ্রিল ০৬, ২০২৬)