রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুরে সদর উপজেলা এলাকায় পাট ও তিল চাষীরা তেল সংকটে ভুগছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় ব্যহত হচ্ছে কৃষকদের চাষাবাদ। এ এলাকায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত কৃষিপন্যের মধ্যে পাট, তিল অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের হাতে এসব কৃষিজাত পণ্যের বীজ বপনের সময় রয়েছে আর মাত্র পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ সাত দিন, অথচ তাঁরা তেলের অভাবে চাষাবাদ করতে পারছেন না অনেকেই। তবে, ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষি অফিস বলছে সমস্যা সমাধানে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাঁরা। তেল সংকটে অধিকাংশ ট্রাক্টর গুলোও বসে রয়েছে। উপজেলার শুধুমাত্র কানাইপুর ইউনিয়নে চাষাবাদের জন্য ট্রাক্টর রয়েছে ৫০ টিরই বেশি।  তেল সংকটে যার অধিকাংশ ট্রাক্টরই গত ৩ থেকে ৭ দিন বসে রয়েছে।

বৃহস্পতিবার চাষাবাদ ব্যহত হওয়ার কথা জানান স্থানীয় ২১ জন ট্রাক্টর মালিক ও ১৬ জন কৃষক। যারা সবাই তেল সংকটে পাট ও তিল খেতের চাষ করতে পারছেন না বলে জানান তারা। তেলের কারণে অনেক কৃষকদের জমি বীজ বপনের উপযুক্ত করে তুলতে পারছেন না বলে অভিযোগ তাদের। আর মাত্র কয়েকদিন হাতে থাকায় উপস্থিত কৃষকগণ হতাশা প্রকাশ করেছেন। মুলতঃ ভৌগলিক কারণে পাট এ অঞ্চলের কৃষকদের অন্যতম প্রধান অর্থকরী কৃষিপণ্য হওয়ায় এবং চাষের সময় শেষ পর্যায়ে আসায় কৃষকদের হতাশা ও ক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

এমতাবস্থায় পাট ও তিল চাষের জন্য জরুরী ভিত্তিতে তাঁদের প্রয়োজনীয় তেল সাপ্লাই ঠিকঠাকভাবে না পেলে এ এলাকায় ওই দুই ফসলের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হুমকিতে থাকার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় কৃষকেরা এতে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই।


ফরিদপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ফরিদপুর সদর এলাকায় সর্বমোট পাট চাষ হয়েছিলো ১৩,৩৪০ হেক্টর জমিতে। চলতি (২০২৫-২০২৬) অর্থবছরে যার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৪০০ হেক্টর। এছাড়া, গত অর্থবছরে তিল চাষ হয়েছিল ২১৯৪ হেক্টরে এবং এ অর্থবছরে তিল চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২৫০ হেক্টর জমিতে। উভয়ের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় বেশি ধরা হলেও তা পুরণে কৃষকদের জরুরি ভিত্তিতে তেল সংকট নিরসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষকগণ। অন্যথায়, এ দুইটি কৃষি পণ্যের উৎপাদন আশানুরূপ ফলাফল না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

কৃষকের এমন তেল সংকট বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফরিদপুর উপজেলা কৃষি অফিস কতটুকু অবগত আছে এবং তা নিরসনে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে- প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয় ফরিদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনের সাথে।

তিনি জানান, 'পাট ও তিল কৃষকদের তেল সংকট নিরসনে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের সাথে যেসব কৃষক তেলের সমস্যা নিয়ে যোগাযোগ করেছেন আমি প্রত্যেককে কমপক্ষে ১০ লিটার করে তেল দেওয়ার স্লিপ করে দিয়েছি। এতে তাঁদের চাহিদা মিটেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। কিন্তু এর বেশি দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। অপরদিকে, ১০ লিটারের বেশি দিলে পাম্পগুলোও তেল দিতে চায় না।' এসময় এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, 'আমি কৃষকদের তেলের চাহিদা মেটাতে তাঁদেরকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর জরুরি ভিত্তিতে আবেদন করতে পরামর্শ দিয়েছি। কৃষকদের আবেদনের ভিত্তিতে আমরা টিএনও স্যারের সাথে কথা বলে কৃষকদের এ তেল সংকট নিরসনের চেষ্টা করে যাচ্ছি'। আনোয়ার আরও জানান, 'পাট ও তিল বীজ বপনে কৃষকদের হাতে আর মাত্র পাঁচ দিন বা বড়জোর এক সপ্তাহ সময় অবশিষ্ট আছে। তাই আমরা এ ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কৃষকদের সমস্যা সমাধানে চেষ্টা অব্যাহত রাখবো'।

এ বিষয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া জানান, 'যাচাই বাছাই করে প্রকৃত কৃষক ও ট্রাক্টর মালিকদের শনাক্ত করে চাহিদা অনুযায়ী তেল সাপ্লাই দিতে ইতিমধ্যে কৃষি কর্মকর্তা ও তেলের পাম্পগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। তারপরও কোনো কৃষক বা ট্রাক্টর মালিক তাঁদের প্রয়োজন অনুসারে তেল না পেলে হয়তো তিনি এ বিষয়ে অবগত নন বলেই বঞ্চিত হচ্ছেন'। এসময় কোনো প্রকৃত কৃষক তাঁদের প্রয়োজনীয় তেল না পেলে সরাসরি তাঁর (ইউএনও) এর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন রাবেয়া। এমনকি কোনো পাম্প কৃষি কর্মকর্তার স্লিপের প্রয়োজনীয় তেল দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই তেল পাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। সেক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তা কোনো কৃষককে ৫০ লিটার তেল দেওয়ার সুপারিশ করলেও পাম্পগুলো ওই কৃষককে সমপরিমাণ তেল দিতে বাধ্য বলেও জানান এ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

তাছাড়া, এ সংকট নিরসনে কৃষকদের যখনই তেলের প্রয়োজন হবে শুক্রবার বা শনিবার বা ছুটির দিন বলতে কোনো কথা নেই, বরং ২৪ ঘন্টা স্থানীয় পাট ও তিল চাষী তথা কৃষকদের জন্য ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস খোলা রয়েছে বলেও জানান ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া।

(আরআর/এএস/এপ্রিল ১০, ২০২৬)