মানিক লাল ঘোষ


আজ ঐতিহাসিক ১০ই এপ্রিল। বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের এক অনন্য বাঁক। ১৯৭১ সালের এই দিনে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা বিশ্বমানচিত্রে ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে পরিচিত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণম্যান্ডেটকে ভিত্তি করে এই সরকার গঠিত হয়। আজকের এই দিনে সেই মহান কারিগরদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

মুজিবনগর সরকার কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল জনগণের ভোটের প্রতিফলন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করে বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভাগ্য নির্ধারণের পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দলকে। পাকিস্তানি জান্তা যখন বিশ্বাসঘাতকতা করে আলোচনা মাঝপথে থামিয়ে ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে গণহত্যা শুরু করে, তখন বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তারের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই মহতী ঘোষণাকেই আইনি ও প্রশাসনিক রূপ দেয় ১০ই এপ্রিলের এই প্রবাসী সরকার।

এই সরকারের কাঠামো ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও দূরদর্শী। পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ কেবল প্রশাসনিক হালই ধরেননি, বরং প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে শিক্ষা ও পরিকল্পনা—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের সমন্বয় করেছেন অসামান্য দক্ষতায়। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানের মতো ত্যাগী নেতাদের নেতৃত্বে অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়গুলো যুদ্ধের চরম সংকটে জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশই দ্বিতীয় রাষ্ট্র, যা একটি আনুষ্ঠানিক ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ বা Proclamation of Independence-এর মাধ্যমে জন্ম লাভ করেছে। এটি কেবল একটি দলিল ছিল না, বরং পুরো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান হিসেবে কাজ করেছে। যেখানে স্পষ্টভাবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নির্দেশনায় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামরা যখন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন, তখন থেকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সফল বৈঠক পর্যন্ত পুরো সময়টি ছিল এক রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা। তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। ৩ এপ্রিলের সেই ঐতিহাসিক বৈঠকে ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু না করলেও মুক্তিফৌজের আশ্রয়, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক হিসাব-নিকাশ থাকা সত্ত্বেও ভারত আমাদের কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিক দৃষ্টান্ত গড়েছিল, তার মূলে ছিল এই সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা।

১০ই এপ্রিল বাংলাদেশের অস্তিত্বের শেকড়। এই দিনটি প্রমাণ করে যে বাঙালির স্বাধীনতা লড়াই ছিল সম্পূর্ণ আইনানুগ, গণতান্ত্রিক এবং নৈতিক। ২৬শে মার্চের ঘোষণা যদি হয় আমাদের জন্মের মন্ত্র, তবে ১০ই এপ্রিলের মুজিবনগর সরকার হলো সেই মন্ত্রকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার কারিগর। আজ ৫ দশকেরও বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ হোক—সেই ঘোষণাপত্রের মূল চেতনা তথা ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বেগবান রাখা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।