ওয়াজেদুর রহমান কনক, নীলফামারী : নীলফামারী জেলায় স্বাস্থ্যসেবার মানচিত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। চীন সরকারের অনুদানে প্রস্তাবিত ১০০০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’ কেবল একটি সুবিশাল স্থাপনা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর একটি মহাপরিকল্পনা। আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় 'স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ' ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে এই মেগা প্রকল্পটি একটি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি সরকারি প্রতিনিধি দল গতকাল শুক্রবার নীলফামারীর প্রস্তাবিত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি আকাশপথে সৈয়দপুর হয়ে নীলফামারী পৌঁছান। তারা প্রস্তাবিত হাসপাতালের কারিগরি উপযোগিতা যাচাই, বিশেষায়িত সেবার পরিধি নির্ধারণ এবং চূড়ান্ত বাস্তবায়ন রোডম্যাপ প্রণয়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন।

এই হাসপাতালের জন্য নির্বাচিত নীলফামারীর দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলস সংলগ্ন স্থানটি কৌশলগত দিক থেকে অনন্য। এটি রংপুর বিভাগের আটটি জেলার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্ব এবং নিকটস্থ মহাসড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের কারণে জরুরি রোগীদের দ্রুত স্থানান্তর করা এখানে অত্যন্ত সহজ হবে। বিশেষ করে উত্তরা ইপিজেডে কর্মরত বিদেশী বিনিয়োগকারী এবং প্রতিবেশী দেশ ভারত (সেভেন সিস্টার্স), নেপাল ও ভুটানের রোগীদের জন্য এটি একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘মেডিকেল হাব’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এটি বাংলাদেশের ‘চিকিৎসা পর্যটন’ বা মেডিকেল ট্যুরিজম খাতে নতুন এক সম্ভাবনা তৈরি করবে।

প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত দূরদর্শী। দারোয়ানী টেক্সটাইল মিলসের অব্যবহৃত প্রায় ৫৩ একর জমি সরকারি মালিকানাধীন হওয়ায় এখানে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের কোনো আইনি জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রিতা নেই। এতে সরকারের শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরকে মাস্টার প্ল্যান ও ব্যয় প্রাক্কলনের জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। জানা গেছে, চীন সরকারের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির পরপরই অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১০০০ মানুষের বিপরীতে অন্তত ৩.৫টি শয্যা থাকা আবশ্যক। নীলফামারীর ২১ লক্ষাধিক মানুষের জন্য বর্তমানে কার্যকর শয্যা সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বিদ্যমান ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ওপর ১০ গুণ বেশি মানুষের চাপ থাকে। ১০০০ শয্যার এই হাসপাতালটি চালু হলে সেই সংকট অনেকাংশে দূর হবে। বিশেষ করে হৃদরোগ, ক্যান্সার বা কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো জটিল রোগের জন্য এই অঞ্চলের মানুষকে আর কষ্ট করে ঢাকা বা বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হবে না। এটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর থেকেও রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে আনবে।

প্রকল্পের প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী, এখানে প্রায় ৩,৫০৪ জন দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে, যার মধ্যে প্রায় ৯০০ জন চিকিৎসক এবং ১২০০ জন নার্স থাকবেন। এই বিশাল জনবলের উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ সৃষ্টি করবে। আবাসন, পরিবহন এবং আনুষঙ্গিক সেবামূলক খাতে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। ১০ তলা বিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল ভবন ও ডক্টরস কোয়ার্টারসহ পুরো এলাকাটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘মেডিকেল সিটি’তে রূপান্তরিত হবে।

প্রস্তাবিত হাসপাতালটির ১০০০ শয্যার মধ্যে ৫০০টি সাধারণ এবং ৫০০টি বিশেষায়িত শয্যা হিসেবে বিন্যস্ত থাকবে। এখানে নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি এবং নিউরোলজির মতো আধুনিক বিভাগসহ উন্নত আইসিইউ ও সিসিইউ সুবিধা থাকবে। এটি কেবল নীলফামারী নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার চিকিৎসা মানচিত্রে বাংলাদেশকে এক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাবে।

নীলফামারীর এই মেগা প্রকল্পটি এসডিজি (SDG) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ স্থানীয় জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করে চক্রান্তমুক্ত পরিবেশে দারোয়ানী টেক্সটাইল মাঠেই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। আজকের এই রাষ্ট্রীয় সফরের প্রতিবেদনটি পরবর্তী ধাপের কাজ শুরু করতে সহায়ক হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নীলফামারী তথা পুরো উত্তরাঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উন্নত ‘হেলথ হাব’-এ পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

(ওকে/এসপি/এপ্রিল ১১, ২০২৬)