আবদুল হামিদ মাহবুব


বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে এই দেড় মাসের মত হল। এই স্বল্প সময়ে সংবিধান-সংবিধান নিয়ে এত এত কথা শুনেছি যে, সংবিধানের প্রতি এক ধরনের বিরক্তিই সৃষ্টি হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার শাসনের বিগত প্রায় ১৬ বছর সংবিধান বিষয়ে যত কথা শুনেছিলাম এই দেড় মাসে যেন তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শুনে ফেললাম।

আসলে কি আমরা সংবিধান মেনেই রাষ্ট্র চালাই? শেখ হাসিনা কি সংবিধানের প্রতি অনুচ্ছেদ, ধারা, উপধারা ধরে ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন? আমার তো মনে হয়, সেটা তিনি করেননি। তার মত করে চালাতে গিয়ে যখন যে যে অংশ প্রয়োজন, তিনি সেটুকু ব্যবহার করে তার মতই চালিয়েছেন। সংবিধানের কোথাও কি লেখা আছে কলাকৌশল করে অনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে দেশ পরিচালনা করা যাবে? ২০১৪ সালে ১৫৩ আসনেই অনির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন!

২০১৮ সালে তো বিএনপিও নির্বাচনে অংশ নিল। কিন্তু এমন কৌশল করে নিশিবেলায় ভোটের কাজ সেরে ফেলা হলো। সেই সংসদ পূর্ণ মেয়াদ কাজ শেষ করল! আর ২০২৪-এ নিজেরা নিজেরা নিজেদের মত যাকে চেয়েছেন তাকেই সংসদ সদস্য বানিয়ে এনে দেশটা নিয়ে এগোতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে যখন বিপ্লব বলুন আর গণঅভ্যুত্থাই বলুন, সেই সেই রূপ যখন নিলো, তখন শেখ হাসিনা শাসক ‘ইয়াজিদ’-এর সেই সীমারের মত নির্দয় হয়ে হাজারের ওপর লাশ ফেলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করল। শরীরের অঙ্গ-পতঙ্গ হারিয়ে কত হাজার হাজার হলেন পঙ্গু।

অবশেষে শেখ হাসিনা তার সভাসদ আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সবাই রক্ষা পেল না। পাঁচশতাধিক জন সেনানিবাসে আশ্রয় নিলেন। সেনাবাহিনী তাদের প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়ে সুযোগে সুযোগে সরে যাওয়ার পথ করে দিল! কেউ কেউ নিরাপদে সরে গেলেন। কিন্তু অনেকেই এখন জালে আটকা পড়ছেন। এইতো সেদিন দেখলাম গত সংসদের স্পিকারকে পুলিশ ধরে এনে কারাগারে পাঠালো!

আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু সংবিধানের প্রসঙ্গ টেনে লেখার সূত্রপাত করেছি। আমার মত অক্ষরজ্ঞানওয়ালা বেয়াক্কেলকেও অতীতে কয়েকবার সংবিধান ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দেশে যখন সংঘাতময় একটা অবস্থা চলছিল, তখন সেই সংবিধান ঘাঁটাঘাঁটি করে আমি লিখেছিলাম ‘সংঘাত এড়াতে একটি নির্বাচনী ফর্মূলা’। সেই লেখা প্রকাশ হওয়ার পর বেশ সাড়া পড়েছিল।

গত কদিন ধরে সংবিধান আর সংবিধান শুনতে শুনতে আবার ঘাঁটাচ্ছি। ঘাঁটাতে গিয়ে সংবিধানের প্রথম ভাগের ‘৭খ’ পড়েই আমি থেমে গেছি। এই ‘৭খ’-তে যে কথাগুলো বলা আছে সেগুলো যদি বহাল রেখে দেওয়া হয় তাহলে এই দেশের ক্ষমতায় যে দলই যাক না কেন, সেই দলই শেখ হাসিনার মত ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবেই। নিশ্চয়ই পাঠকরা জানতে চাচ্ছেন ‘৭খ’-কি আছে?

‘৭খ’-তে আছে “সংবিধানে ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপণ, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।”

যেসব বিষয় “সংশোধন অযোগ্য হইবে” উল্লেখ করে সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে, সেগুলো আর এখানে দিলাম না। দিলে এই লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে। আমি মনে করি আমার এই লেখার পাঠক সকলেই ‘গুগল’ সার্চ করতে জানেন। কেউ যদি পুরোটা পড়তে চান, তবে গুগলে সার্চ করে সংবিধানের সেই অংশগুলো পড়ে নেবেন।

সংবিধানে লিখা রাখা এই সাড়ে পাঁচ লাইন সারা সংবিধানের রক্ষক হয়ে আছে! এবার একজন সাধারন মানুষ হিসাবে ভাবুন, সংবিধানের এই অংশ থাকা অবস্থায় কোন পরিষদের কি ক্ষমতা আছে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন কিংবা সংশোধন ঘটানোর? আমি জানিনা আমাদের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবী প্রস্তাব আলোচনার জন্য উত্থাপিত হলে, তিনি এত এত বই সামনে আনার জন্য বলেছিলেন কেন? তিনি যখন ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখলেন, তখন তো আমার মনে হল বক্তব্যটি তিনি সংসদে নয় পল্টন ময়দানে দিচ্ছেন। তিনি যেসব বইয়ের কথা বলেছিলেন, এমন কি মদীনা সনদের প্রসঙ্গ থেকেও তো তেমন কোনো উদ্ধৃতি দিতে দেখলাম না! তাহলে কি একজন আমজনতা হিসেবে ধরে নেব, আমাদের লেখালেখির শুরুর দিকে কোনো কোনো বন্ধু ইংরেজি সাহিত্যের বই বগলে নিয়ে ঘুরাঘুরি করতো। তারা আমাদের বোঝাত ওইসব ইংরেজি বই তারা পড়ে নতুন নতুন সাহিত্য শিখছে। আমরা তাদের আঁতেল বলতাম! আইনমন্ত্রী তার পাণ্ডিত্য দেশবাসীকে জানান দেওয়ার জন্য কি ওইসব বইয়ের কথা বলেছিলেন?

আমি জানি এই আইনমন্ত্রী খুবই পণ্ডিত একজন মানুষ। আইনের এমন কোন বিষয় নেই, যা তিনি জানেন না। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু যেসব বইয়ের কথা বললেন, অথচ তার বক্তব্যেই সেসব বই থেকে তেমন কিছুই উদ্ধৃত হলো না! তাই আমি প্রসঙ্গটি টেনে আনলাম।

গত (০৭ এপ্রিল ২০২৬) মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন কেন অপরিহার্য?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে বিচারপতি এম এ মতিন আমাদের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন। প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী সংসদ সদস্যগণকে হবস পড়ার উপদেশ দিয়েছেন। হবসের দর্শন হচ্ছে দেশের শাসক হবেন এমন একজন, যিনি হবেন সর্বশক্তিমান এবং সকল আইনের ঊর্ধ্বে। যেমন রোমান সম্রাটরা ছিল। হবসের দর্শন অনুসরণ করে সে যুগে স্বৈরাচার জন্ম নিয়েছিল। আমরা কি আবার স্বৈরশাসক চাচ্ছি?’

প্রবন্ধে বলা হয়, আগের আইনমন্ত্রীরা শেখ হাসিনাকে হবস পড়িয়েছিলেন। তাঁকে জন অস্টিনের ‘কমান্ড থিওরি’ ভালো করে পড়িয়েছিলেন। ফলে তাঁকে শেখানো হয়েছে শাসকের আদেশই আইন। অথচ অস্টিনের জায়গা এইচ এল হার্ট দখল করার পর ইউরোপের আইনের জগতে সন্নিবেশিত হয়, আদেশ নয়, বিধিই আইন। কিন্তু হাসিনাকে সেই আইন পড়ানো হয়নি। হাসিনাসহ তাঁর আইনমন্ত্রী ‘হায়ার ল’ অমান্য করেছিলেন। তাঁরা আজ কোথায়?

তিনি জন লকের একটি মতবাদকে উদ্ধৃত করে বলেন, শাসক যখন নির্যাতক হয়ে যায়, তখন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেওয়া মানুষের স্রষ্টা প্রদত্ত অধিকার।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে যে তিনজন রাষ্ট্রচিন্তাবিদের ‘সামাজিক চুক্তি মতবাদ’ নিয়ে আলোচনা এসেছে, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’ (১৬৫১)। তিনি মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর ও বিশৃঙ্খল। তাই সমাজকে শান্ত রাখতে একজন ‘নিরঙ্কুশ’ বা সর্বশক্তিমান শাসকের প্রয়োজন। তাঁর মতে, জনগণ নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে শাসকের কাছে সব ক্ষমতা সঁপে দেয় এবং শাসকের আদেশ অমান্য করার অধিকার তাদের থাকে না।

ইংল্যান্ডের চিকিৎসক এবং দার্শনিক জন লককে (১৬৩২-১৭০৪) বলা হয় ‘উদারতাবাদের জনক’। তাঁর প্রধান কাজ ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ (১৬৮৯)। হবসের উল্টো পথে হেঁটে লক বলেন, মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার হলো প্রাকৃতিক বা জন্মগত অধিকার। সরকার গঠিত হয় জনগণের সম্মতিতে এই অধিকারগুলো রক্ষার জন্য। যদি কোনো শাসক এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হন বা অত্যাচারী হন, তবে সেই সরকারকে উৎখাত করার অধিকার জনগণের রয়েছে।

জেনেভায় জন্ম নেওয়া জঁ-জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) একজন ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ (১৭৬২) গ্রন্থের জন্য বিশ্বখ্যাত। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।’ রুশোর মতে, রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা জনগণের সামষ্টিক মতের ভিত্তিতে। তাঁর এই দর্শনেই আধুনিক গণতন্ত্র ও ফরাসি বিপ্লবের বীজ নিহিত ছিল।’

সংসদে বিএনপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হবে। আমাদের আইনমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে সংবিধানে ‘৭খ’ বহাল থাকা অবস্থায় কি করে মূল (জুলাই জাতীয় সনদে থাকা) জায়গাগুলোতে পরিবর্তন কিংবা সংশোধন আনবেন? শেখ হাসিনা কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দিয়ে কুটিল বুদ্ধিতে খুবই জটিল ভাবে সংবিধান সংশোধন করিয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়েও সংবিধানের মূল বিষয়গুলো সংশোধনের পথ বন্ধ করে রেখেছে। অবশ্য বর্তমান সংসদের কাছে গণভোটের ফলাফল আছে। এই ফলাফল জনগণের অভিমতের প্রকাশ। এটাকে মূল্যায়ন করেই একমাত্র সংবিধানের ভিতরে প্রবেশ করার পথ খুলতে হবে। আর সংবিধান এভাবে রেখেই যদি বর্তমান সরকার এগোতে চায়, তা হলে শেখ হাসিনার মত যখন প্রয়োজন, সংবিধানের যে অংশ পক্ষে পাওয়া যাবে, সে অংশ মানব। আর যে অংশ পক্ষে পাওয়া যাবেনা সেটা লংঘন করব!

উপরের শেষ দুই বাক্যের মতোই কি দেশটা চলবে? যদি এভাবে চলে; তাহলে আগামীতেও আমরা দেখব রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফ্যাসিস্ট বসে আছে। জনতা কি তখন চুপ করে থাকবে? নব্বই এবং চব্বিশ বুঝিয়ে দিয়েছে একটা সময় পর্যন্ত আমজনতাকে ঠেকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু কোনো না কোনো সময় এই জনতা বিস্ফোরণে গর্জে উঠে সব তোলপাড় করে দেয়। আমরা কি একটা স্থিতিশীল রাষ্ট্রের পথে হাঁটবো না? এই দেশের মানুষ কি কেবল নব্বই কিংবা চব্বিশ ঘটানো নিয়েই ব্যস্ত থাকবে?

আমি এই লেখা যখন লিখছি আমার মাথায় গুনগুন করছে লালনের সেই বিখ্যাত একটি চরণ, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। বিষয় সংবিধান; কিন্তু মাথায় কেনো ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ ঘুরছে বুঝতে পারছি না! আমার মনে হচ্ছে; আমরা কেবল সময়কে যেতেই দিচ্ছি, যেতেই দিচ্ছি! আমরা কি সময় যেতেই দেবো? এভাবে যেতেই দেবো? সময় যেতে যেতে আমরা কোন সীমানায় গিয়ে পৌঁছাবো? তাই বলি সকলের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।