দিলীপ চন্দ, বিশেষ প্রতিনিধি : অভাবের তাড়নায় ১৯ বছর বয়সে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর লেবাননে। নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন পরিবারের ভবিষ্যৎ। ভাই-বোনদের বিয়ে দিয়েছেন, মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে তৈরি করেছেন টিনের ঘর। কিন্তু সেই ঘরে নিজের আর থাকা হলো না ফরিদপুরের মেয়ে দিপালী খাতুনের। গত বুধবার বৈরুতের হামরা এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

নিহত দিপালী খাতুন ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামের দিনমজুর মোফাজ্জল শেখের মেজো মেয়ে। তার মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছানোর পর থেকেই পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতের বাড়িতে চলছে স্বজনদের হৃদয়বিদারক আহাজারি।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দিপালীর মা মারা গেছেন আট বছর আগে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো। অভাবের সংসারে সবার মুখে হাসি ফোটাতে ২০১১ সালে প্রথম লেবাননে যান তিনি। মাঝে কয়েকবার দেশে ফিরলেও সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি পুনরায় লেবাননে পাড়ি জমান। সেখানে গৃহপরিচারিকার কাজ করে যে অর্থ পাঠাতেন, তা দিয়েই মূলত চলত তাদের অভাবের সংসার। বড় বোন শেফালী থেকে শুরু করে ছোট ভাই-বোন সবার বিয়ে দিয়েছেন তিনি। নিজের বিয়ের প্রস্তাব এলে বারবার ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন, "আগে পরিবারকে গুছিয়ে নেই।"

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যখন তিনি শেষবার দেশে আসেন, পরিবার তাকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়। কিন্তু স্বাবলম্বী দিপালী সংসারের হাল ধরতে আবারও প্রবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকটা জেদ করেই গত বছরের এপ্রিলে তিনি শেষবারের মতো লেবাননে যান। ছোট বোন লাইজু বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, "আমার আপা নিজের সুখের কথা কোনোদিন ভাবেনি। সারাজীবন আমাদের ভালো রাখার চেষ্টা করে গেছে। সেই যুদ্ধ আজ আমার আপার প্রাণ কেড়ে নিলো। আমরা এখন শুধু তার মরদেহটুকু ফেরত চাই।"

এ বিষয়ে ফরিদপুর প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক আশিক সিদ্দিকী জানান, নিহতের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সব ধরনের চেষ্টা চলছে।

চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া মমতাজ বলেন, "আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ রাখছি। মরদেহ বিমানবন্দর থেকে বাড়িতে আনা এবং দাফন-কাফনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।"

দিপালীর বাবা মোফাজ্জল শেখ স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন তার প্রিয় কন্যার তৈরি করা নতুন টিনের ঘরের দাওয়ায়। যে মেয়ের উপার্জনে সংসারের দুঃখ দূর হয়েছিল, সেই মেয়ের নিথর দেহের প্রতীক্ষায় এখন প্রহর গুনছেন এক অসহায় পিতা।

(ডিসি/এসপি/এপ্রিল ১১, ২০২৬)