কাপ্তাইয়ের জলে ভাসলো ফুল, পাহাড় মাতলো তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বিষু’ উৎসবে
রিপন মারমা, রাঙ্গামাটি : “সংস্কৃতির ঐতিহ্যের শিকড়ের টানে” —এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে রাঙ্গামাটি কাপ্তাইয়ে অত্যন্ত আনন্দঘন ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বিষু’।
বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা (কাপ্তাই অঞ্চল এবং দেবতাছড়ি-রৈস্যাবিলি অঞ্চল কমিটি)-এর যৌথ উদ্যোগে আজ রবিবার দিনব্যাপী বর্ণিল কর্মসূচির মাধ্যমে এই উৎসব পালিত হয়।
এদিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই তঞ্চঙ্গ্যা পল্লীগুলোতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ৮টায় কর্ণফুলী সরকারি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় তঞ্চঙ্গ্যা তরুণ-তরুণীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী রঙ-বেরঙের পোশাক পরিধান করে কর্ণফুলী নদীর জলে ‘ফুল ভাসানো’র মধ্য দিয়ে উৎসবের শুভ সূচনা করেন। পুরোনো বছরের সকল দুঃখ-গ্লানি মুছে ফেলে নতুন বছরের মঙ্গল কামনায় এই ‘ফুল গছানো’ বা ফুল ভাসানো তঞ্চঙ্গ্যা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সকাল সাড়ে ৯টায় কাপ্তাই উপজেলা কর্ণফুলী স্টেডিয়াম থেকে একটি বিশাল র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে তঞ্চঙ্গ্যা নারী-পুরুষ ও শিশুরা তাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ঢাক-ঢোল আর বাঁশির সুরে নেচে-গেয়ে অংশ নেন। র্যালিটি কাপ্তাই উপজেলা সদরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে উপজেলা অফিসার্স ক্লাব চত্বরে এসে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
র্যালি পরবর্তী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, "বিষু উৎসব আজ কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়, বরং এটি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের এই সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্য একদিন বিশ্ব দরবারে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হবে।"
ওয়াগ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চিরনজীত তঞ্চঙ্গ্যা-এর সভাপতিত্বে এবং উৎসব উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব রূপময় তঞ্চঙ্গ্যা-এর সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, কাপ্তাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ মাহমুদুল হাসান রুবেল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পরিচালক নির্মল চন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা।বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা কাপ্তাই অঞ্চলের সভাপতি অজিত কুমার তঞ্চঙ্গ্যা।
উৎসব উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অরুন তালুকদার।বিকেলে সাক্রাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত হয় তঞ্চঙ্গ্যাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলা এবং এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে স্থানীয় শিল্পীরা তঞ্চঙ্গ্যাদের নিজস্ব কৃষ্টির বিলুপ্তপ্রায় গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন, যা উপস্থিত দর্শকদের বিমোহিত করে।
বক্তারা নতুন প্রজন্মের কাছে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এবং তা সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈসাবি উৎসবের অংশ হিসেবে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায় প্রতিবছর এই ‘বিষু’ পালন করে থাকে, যা পাহাড়ি জনপদে ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
(আরএম/এসপি/এপ্রিল ১২, ২০২৬)
