রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি ইউনিয়নের ফয়জুল্লাহপুর গ্রামের দুটি ভূমিহীন পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। পহেলা বৈশাখ বুধবার দুপুরে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেএম শাখার সহকারি কমিশনারের নেতৃত্বে ওই দুটি পরিবারকে উচ্ছেদের পর তারা খোলা আকাশের নীচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার দৃশ্য ভিডিও ধারণ করায় এক গ্রাম ডাক্তারসহ একাধিক ব্যক্তির মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। দুধের বাচ্চাকে নিয়ে পায়ে ধরলেও কোন সহযোগিতা মেলেনি ওই দুই পরিবারের।

ফয়জুল্লাহপুর ঋষিপাড়ার মৃত আবু সাঈদ সরদারের ছেলে ভ্যানচালক মোঃ আলাউদ্দিন সরদার জানান, ফয়জুল্লাহপুর- থেকে ফিংড়িগামি পাকা সড়কের পূর্বপাশে ঋষিপাড়ায় এসএ ২৪২ ও ১ নং খাস খতিয়ানের বিআরএস ৫৯৯ দাগের পাঁচ শতক নীচু জমিতে মাটি ভরাট করে ৩৫ বছর আগে থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে তিনি সেখানে বসবাস করে আসছেন। একইভাবে তারই পাশে রমা কুমার মন্ডল চার শতক জমিতে একটি বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি সন্তানসহ স্বপরিবারে বসবাস করে আসছেন। ছয় বছর আগে তাদের বসবাসকৃত জমির পূর্ব দিকে একুশে টেলিভিশনের সাংবাদিক পরিচয়ে মনিরুল ইসলাম মিনি শহরের সুলতানপুরের আবু মুছার কাছ থেকে ২৫ শতক জমি কেনেন।

এক বছর পর তিনি আরো দুটি প্লট কেনেন। নিজের কেনা জমি ছাড়াও তিনি পাঁচ শতকের বেশি খাস জমি দখলে রেখেছেন। মনিরুল ইসলাম মিনির জমিতে যাওয়ার জন্য তার জমির উত্তর পাশ দিয়ে সরকারি জায়গার উপর দিয়ে আট ফুট রাস্তা রয়েছে। জমি কেনার পর মনিরুল ইসলাম মিনির জমি ও ফসল তিনি দেখভাল করতেন। দুই বছর আগে মনিরুল ইসলাম মিনি তাকে অন্যত্র সরকারি ঘর দেওয়ার কথা বলে সেখান থেকে চলে যাওয়ার কথা বলেন। তিনি রাজী হননি। একপর্যায়ে তাকে উচ্ছেদ করার হুমকি দেওয়া হয়।

দেড় বছর আগে মনিরুল ইসলাম মিনির অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় ফিংড়ি ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা তাকে ও রমা কুমার মন্ডলকে নোটিশ করেন। বিষয়টি নিয়ে তারা সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোয়াইব আহম্মদ ও সদর সহকারি কমিশনার (ভূমি) অতিশ সরকারের সঙ্গে কথা বলার পর তাদের উচ্ছেদ না করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন তারা। এরপরও মনিরুল ইসলাম মিনি সম্প্রতি নিজেকে প্রেসক্লাবের একাংশের সভাপতি সেজে তাদেরকে উচ্ছেদ করার জন্য প্রশাসনে প্রভাব খটিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার পক্ষ থেকে তাদেরকে উঠে যাওয়ার জন্য দরজার গায়ে নোটিশ লটকে যাওয়া হয়।

আলাউদ্দিন সরদার আরো জানান, গত পহেলা বৈশাখ বুধবার সকাল ১১টার দিকে স্থানীয় তহশীলদারসহ কয়েকজন এসে কোর্টের আদেশ আছে, ম্যাজিষ্ট্রেট আসছেন। ১০ মিনিটের মধ্যে তাদের ঘরবাড়ি থেকে মালামাল সরিয়ে নিতে বলা হয়। এ সময় তাদের সঙ্গে বুধহাটার লাল বাহিনীর প্রধান যুবলীগ নেতা সাদ্দামসহ ১০/১২জন হাজির হন। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ও একদল পুলিশ হাজির হতেই সাদ্দাম বাহিনীর সদস্যরা তাদের টিনের বেড়াসহ ঘরের মধ্যে সকল জিনিসপত্র বের করে এনে ফেলে দেন। তার ও তার (আলাউদ্দিন) চাচা রফিকুলের নামে থাকা দুটি বৈদ্যুতিক মিটার ও রমা কুমার মন্ডলের বৈদ্যুতিক মিটার ছিঁড়ে দেওয়া হয়।

তার ছেলে আল আমিনের চার মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে ম্যাজিস্টেট সাহেবের পায়ে ধরলেও কোন কথা শুনতে চাননি তিনি। একইভাবে রমা ও তার স্ত্রী প্রতিবন্ধি ছেলে বিধান মন্ডলকে নিয়ে হাতে পায়ে ধরলেও সাইফুল ইসলামের মন গলেনি। লক্ষাধিক টাকার মালামাল নষ্ট করার পর আগামি এক সপ্তাহের মধ্যে তাদেরকে ঘরের চাল সরিয়ে নিতে বলা হয়। এর ব্যত্তয় হলে বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়ার হুশিয়ারি দেওয়া হয়। এরপর থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নীচে থাকার বিষয়টি তারা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তাদের রান্না করার সরঞ্জামসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ফলে তারা অন্যের বাড়ি থেকে হাঁড়ি যোগাড় করে রান্না করছেন। শুক্রবার বিকেলে পুলিশ যেয়ে তাদেরকে চলে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছেন।

ভূমিহীন আলাউদ্দিনসহ স্থানীয় উত্তম মন্ডল, সামছুর রহমানসহ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, সাংবাদিক পরিচয়ে মিনি তার জমির শ্রীবৃদ্ধি করে বাজারমূল্য বাড়াতে জেলা প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে রাস্তার পাশে থাকা (আলাউদ্দিনের পাশে) আবু সাঈদের মালিকানাধীন সিয়াম ফার্মসহ বেশ কয়েকটি দোকান, একটি মন্দির ও বসতি উচ্ছেদের আবেদন না করে শুধুমাত্র আলাউদ্দিন ও রমা কুমার মন্ডলের বিরুদ্ধে উচ্ছেদের আবেদন করেছেন। একদিকে প্রেসক্লাবে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের পাশে বসে নববর্ষের অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন, অপরদিকে ভূমিহীন পরিবারের উচ্ছেদ করার সংবাদ মুঠোফোনে বারবার খোঁজ নিয়েছেন মনিরুল ইসলাম মিনি।

রমা কুমার মন্ডল বলেন, তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর সেখানে বসবাস করছেন। ওই জমি বন্দোবস্ত দলিলের জন্য তিনি ২০১৩ সালে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন।

সাতক্ষীরার অবসরপ্রাপ্ত এক ভূমি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাস্তা বা অন্য কোন সরকারি প্রকল্পের সুবিধাথে সরকারি খাস জমি প্রয়োজনে কাউকে উচ্ছেদ করতে হলে তাকে পূর্ণবাসন করার মানবিক বিধান রয়েছে। সেটা না করে শুধুমাত্র ১৯৭০ সালের সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভূমি ও ইমারত দখল পূণঃদখল আইনের ৪ ও ৫ ধারা অনুযায়ি বা ২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ ও প্রতিকার আইন ব্যবহার করে একই জায়গার প্রভাবশালীদের পাকা ঘর বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে শুধুমাত্র দুটি ভূমিহীন পরিবারকে উচ্ছেদ করা ন্যয়বিচার পরিপন্থি। সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রধানগণ ১৯৭০ সালের সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভূমি ও ইমারত দখল পূণঃদখল আইনের ৬ ধারা মোতাবেক জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করে প্রতিকার চাইতে পারবেন।

এ ব্যাপারে সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মিনি শনিবার সকালে এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি আলাউদ্দিন সরদার ও রমা কুমার ম-লকে সরকারি খাস জমি থেকে উচ্ছেদের জন্য এক বছরের বেশি সময় আগে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন। সে অনুযায়ি তাদেরকে বুধবার উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন। তবে তার কেনা জমির মধ্যে ৫ শতকের বেশি সরকারি খাস জমি রয়েছে কিনা বা নিজের জমির অবস্থানের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে বেশ কয়েকটি দোকান ও প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে সাংবাদিকের প্রভাব বিস্তার করে দুটি ভূমিহীন পরিবারকে উচ্ছেদ করানোর উদ্যোগ নিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার মধ্যে খাস জমি থাকলে সরকার বের করে নিক। তার যেটুকু প্রয়োজন মনে হয়েছে সেইটুকু উচ্ছেদের আবেদন করেছিলেন তিনি।

ফয়জুল্লাহপুর গ্রামের পল্লী চিকিৎসক উত্তম মন্ডল জানান, বুধবার সকাল ১১টার দিকে তিনি বাড়ি থেকে মটর সাইেেকলে ব্রহ্মরাজপুর বাজারে যাওয়ার সময় উচ্ছেদ অভিযান থেকে দাঁড়িয়ে যান। এ সময় তিনি অভিযানের দৃশ্য মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করায় ম্যাজিষ্ট্রেট সাইফুল ইসলাম তা কেড়ে নেন। কিছুক্ষণ পর ফুটেজ মুছে দিয়ে ফোন ফেরৎ দেওয়া হয়।

ফিংড়ি ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা শেখ ফরিদ হাসান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ি তিনি প্রতিবেদন দিয়েছেন। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ি তিনি বুধবার উচ্ছেদ অভিযানে উপস্থিত ছিলেন। নির্দেশ অনুযায়ি তিনি কয়েকজন শ্রমিককে উচ্ছেদের সময় ডেকে এনেছিলেন।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেএম শাখার সহকারি কমিশনার সাইফুল ইসলাম কারো ফোন কেড়ে নেওয়া ও কারো সঙ্গে অসদাচরনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ি তিনি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছেন। আলাউদ্দিন ভূমিহীন হলেও ভূমিহীন রমা কুমারকে এল্লারচরে আবাসন প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে রমা কুমার মন্ডল যাননি।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ আফরোজা আখতার জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে পরবর্তীতে নিশ্চিত করা যাবে।

(আরকে/এসপি/এপ্রিল ১৮, ২০২৬)