উত্তরের অরণ্যজনপদে খুশির হাওয়া, সংরক্ষিত আসনে আদিবাসী কন্যা আন্না মিন্জ
শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর : ৫৫ বছর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই প্রথম উত্তর জনপদ বৃহত্তর দিনাজপুরে (দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদের চৌকাঠে পা রাখছেন এক জনজাতি কন্যা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মনোনয়ন লাভ করেছেন বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের ঠাকুরগাঁওয়ের মেয়ে আন্না মিন্জ। সংসদের তিনি নাটোর এলাকা থেকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন।
আজ সোমবার বিকালেই তিনি নির্বাচন কমিশনে নিজের আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। ওরাওঁ সম্প্রদায়ের এই লড়াকু মেয়ের সাফল্যে এখন উৎসবের মেজাজ ঠাকুরগাঁওয়ের সিকদারহাট মাদারগঞ্জ গ্রামে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের প্রয়াত পাউলুস মিন্জের বড় মেয়ে আন্না। শৈশব থেকেই পড়াশোনায় তুখোড়। দিনাজপুর সেন্ট ফিলিপ্স থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকার হলি ক্রস থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ইডেন কলেজ থেকে বিএসসি করেন তিনি। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে পাড়ি দেন সুদূর বিলেতে। লন্ডনের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে ব্র্যাকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি সংস্থাটির ‘সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর’ হিসেবে কর্মরত।
পারিবারিক সূত্রে আন্না যেমন প্রগতিশীল ঘরানার, তেমনই তাঁর বৈবাহিক সূত্রেও রাজনীতির যোগ নিবিড়। তাঁর স্বামী অ্যাডভোকেট জন গোমেজ পেশায় আইনজীবী হলেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত এবং বর্তমানে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক সহ-সম্পাদক। দম্পতির দুই সন্তানই বর্তমানে কানাডায় কর্মরত।
আন্নার রক্তে মিশে আছে দেশপ্রেম। তাঁর ভাই রবিন মিন্জ ছিলেন এক জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। পরিবারের অন্য সদস্যরাও কেউ জনপ্রতিনিধি, কেউ বা সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদে আসীন। তবে এত সাফল্যের মাঝেও নিজেদের কৃষিজীবী পরিচয় এবং আদিবাসী সত্তাকে কখনও ভুলে যাননি মিন্জ পরিবার। ঠাকুরগাঁও জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নেতা দুলাল তিগ্যা বলেন, “এক আদর্শ পরিবারে আন্নার জন্ম। তাঁর এই অর্জন গোটা ওরাওঁ সম্প্রদায়ের জয়।”
পেশাগত জীবন: তিনি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল (BRAC International) এবং এর আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থায় (যেমন- কেয়ার বাংলাদেশ, কারিতাস) দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন।
তিনি 'গার্লস নট ব্রাইডস বাংলাদেশ চ্যাপ্টার' এবং 'এনগেজিং মেন অ্যান্ড বয়েজ অ্যালায়েন্স, বাংলাদেশ'-এর আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তাকে সংরক্ষিত নারী আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হওয়ার পর আপ্লুত আন্না মিন্জ। নাটোর এলাকা থেকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছি। এখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ এল। প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর সংসদে পৌঁছে দেওয়াই আমার লক্ষ্য।”
স্বাধীনতার পর এই প্রথম সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে কোনও নারী সংসদীয় রাজনীতিতে এমন গুরুত্বপূর্ণ মোড় পাওয়ায় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন সংগঠন তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘুচিয়ে আন্না এখন উত্তরের জনপদে একনতুন আশার নাম।
(এসএস/এসপি/এপ্রিল ২০, ২০২৬)
