ওয়াজেদুর রহমান কনক


যে বিশাল নীল গ্রহটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিটি নিশ্বাস এবং প্রতিটি স্বপ্ন আবর্তিত হয়, তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা প্রকাশের মুহূর্ত এটি। মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতায় আমাদের এই একমাত্র নিরাপদ আবাসের অস্তিত্ব আজ অভূতপূর্ব এক সংকটের মুখোমুখি। যখন আমরা জলবায়ু বিবর্তন এবং বাস্তুসংস্থানিক ভারসাম্যহীনতার এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, তখন প্রকৃতির সাথে মানুষের এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের নতুন মূল্যায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এটি কেবল একটি উপলক্ষ নয়, বরং মাটির প্রতি আমাদের নাড়ির টান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার এক বৈশ্বিক অঙ্গীকার। আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার এই লড়াইয়ে আমাদের সম্মিলিত সচেতনতাই হতে পারে একমাত্র রক্ষাকবচ। যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা প্রকৃতির ঊর্ধ্বে কেউ নই, বরং প্রকৃতিরই এক ক্ষুদ্র অংশ; আর প্রকৃতির সুরক্ষা মানেই আসলে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের সুরক্ষা।

২২ এপ্রিল ‘বিশ্ব ধরিত্রী দিবস’ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিনপঞ্জির অংশ নয়, বরং এটি সমকালীন ভূ-রাজনীতি, পরিবেশবাদী দর্শন এবং অস্তিত্ববাদী সংকটের এক গভীরতম স্মারক। ১৯৭০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, আজ তা একবিংশ শতাব্দীতে এসে এক অতি-জরুরি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এই দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে ধরিত্রীকে একটি ‘অখণ্ড সত্তা’ বা ‘গাইয়া হাইপোথিসিস’-এর আলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে, যেখানে পৃথিবী কেবল মানুষের ভোগের আধার নয়, বরং একটি স্বয়ংক্রিয় এবং সংবেদনশীল জৈবনিক কাঠামো। আধুনিক শিল্পোন্নত বিশ্ব যখন পুঁজি আর প্রবৃদ্ধির নেশায় মত্ত, তখন ধরিত্রী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রাকৃতিক মূলধন বা ন্যাচারাল ক্যাপিটাল ফুরিয়ে গেলে কোনো অর্থনৈতিক মডেলই মানবসভ্যতাকে রক্ষা করতে পারবে না।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই জটিল সন্ধিক্ষণে ধরিত্রী দিবসের তাৎপর্য মূলত ‘নৃতাত্ত্বিক প্রভাব’ বা অ্যানথ্রোপোসিন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিহিত। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন যে, আমরা এখন ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির (Sixth Mass Extinction) দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের গলন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এগুলো ধরিত্রীর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার এক একটি লক্ষণ। এই প্রেক্ষিতে ধরিত্রী দিবস আমাদের ‘ইকোলজিক্যাল জাস্টিস’ বা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের কথা বলে। উন্নত বিশ্বের অতি-ভোগবাদ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে যে ব্যবধান, তা ধরিত্রীর স্বাস্থ্যের ওপর চরম আঘাত হানছে। তাই এই দিবসের মূল দর্শন হলো বৈশ্বিক সংহতি, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রকে তার কার্বন নিঃসরণের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারও এই দিবসের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একটি সুস্থ ধরিত্রী মানে কেবল দূষণমুক্ত বাতাস নয়, বরং এটি হলো অণুজীব থেকে শুরু করে বিশাল নীল তিমির এক সুশৃঙ্খল সহাবস্থান। বাস্তুসংস্থানের প্রতিটি অংশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। যখন আমরা একটি বনাঞ্চল উজাড় করি বা কোনো জলাভূমি ভরাট করি, তখন আমরা আসলে ধরিত্রীর সেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করি যা আমাদের মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে পারত। ধরিত্রী দিবস আমাদের শেখায় যে, পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি আমাদের বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত। ‘রিজেনারেটিভ ইকোনমি’ বা পুনরুৎপাদনশীল অর্থনীতির ধারণাটি এখন তাই ধ্রুপদী পরিবেশবাদের বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে, যা ধরিত্রীর সম্পদ কেবল ব্যবহার নয় বরং তা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধরিত্রী দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর হয়েছে ‘নেট জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অঙ্গীকারগুলোর বাস্তবায়নের তাগিদে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, প্লাস্টিক দূষণ রোধ এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থার প্রবর্তন—এই প্রতিটি বিষয়ই ধরিত্রী দিবসের চেতনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই দিবসটি আমাদের বাধ্য করে আত্মসমালোচনা করতে যে, আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কি কেবল ধ্বংসাবশেষ রেখে যাব, নাকি একটি প্রাণবন্ত পৃথিবী উপহার দেব। নৈতিকভাবে বিচার করলে, ধরিত্রী দিবস হলো পৃথিবীর প্রতি মানুষের ‘ঋণ স্বীকারের’ দিন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা পৃথিবীর মালিক নই, বরং এর নগণ্য অংশ মাত্র। ধরিত্রীকে সুস্থ রাখার অর্থ হলো নিজেদের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখা। তাই এর তাৎপর্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি দৈনন্দিন জীবনদর্শনে পরিণত করা আজ সময়ের দাবি।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারও এই দিবসের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একটি সুস্থ ধরিত্রী মানে কেবল দূষণমুক্ত বাতাস নয়, বরং এটি হলো অণুজীব থেকে শুরু করে বিশাল নীল তিমির এক সুশৃঙ্খল সহাবস্থান। প্রতি বছর আমরা প্রায় ১০ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি হারাচ্ছি, যা পৃথিবীর অক্সিজেন সরবরাহ ও কার্বন শোষণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা এতটাই যে, প্রতি বছর প্রায় ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়ে মিশছে, যা সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ধরিত্রী দিবস আমাদের শেখায় যে, পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি আমাদের বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত। ‘রিজেনারেটিভ ইকোনমি’ বা পুনরুৎপাদনশীল অর্থনীতির ধারণাটি এখন তাই ধ্রুপদী পরিবেশবাদের বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে, যা ধরিত্রীর সম্পদ কেবল ব্যবহার নয় বরং তা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধরিত্রী দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর হয়েছে ‘নেট জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অঙ্গীকারগুলোর বাস্তবায়নের তাগিদে। বৈশ্বিক উষ্ণতাকে ১.৫° সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৪৫% কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, বিশেষ করে সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার গত এক দশকে বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পেলেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। ধরিত্রী দিবস আমাদের বাধ্য করে আত্মসমালোচনা করতে যে, আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কি কেবল ধ্বংসাবশেষ রেখে যাব, নাকি একটি প্রাণবন্ত পৃথিবী উপহার দেব। নৈতিকভাবে বিচার করলে, ধরিত্রী দিবস হলো পৃথিবীর প্রতি মানুষের ‘ঋণ স্বীকারের’ দিন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা পৃথিবীর মালিক নই, বরং এর নগণ্য অংশ মাত্র। ধরিত্রীকে সুস্থ রাখার অর্থ হলো নিজেদের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত রাখা। তাই এর তাৎপর্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি দৈনন্দিন জীবনদর্শনে পরিণত করা আজ সময়ের দাবি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।