মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। গত প্রায় ১ মাসে এখানে তিনটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টার একজন আত্মহত্যা চেষ্টাকারীকে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। ২৫ থেকে ৪৫ বছরের পুরুষ ব্যক্তিরাই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। পারিবারিক কলহ, মাদক সেবন ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এসব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয় ও পুলিশের সাথে কথা বলে জানা গেছে। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে এসকল আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে।

বুধবার দিবাগত রাতের যে কোন সময় তাহিদুর রহমান কল্পো খান নামে ২৫ বছরের এক যুবক আত্মহত্যা করেছে। তার বাড়ি উপজেলার মালির অংক গ্রামে। তার পিতার নাম রুহুল আমিন।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে খবর পেয়ে পুলিশ তার বাড়ির ঘরের আড়ার সাথে ফাঁস দেয়া অবস্থায় লাশ উদ্ধার করে। পরে ময়না তদন্তের জন্য লাশ মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়।

স্থানীয় ও পুলিশের সাথে সাথে কথা বলে জানা যায়, কল্প খান একজন মাদক সেবী ছিল। মাদক সেবনের কারণে তার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তার নিজ পিতা গত ৫ অক্টোবর থানায় মামলা দিয়ে ২ ছেলেকে জেলে প্রেরণ করে। মাত্র ২দিন আগে মায়ের অনুরোধে বাবাই তাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনে। কিন্তু বুধবার ২২ মার্চ সে নেশার টাকার জন্য বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের মার ধর করে। এ সময় পরিবারের সদস্যরা তাকে অকটি ঘরে তালাবন্ধ করে রাখে সকালে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ গিয়ে ঘরের আড়ার সাথে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে।

এ ঘটনার মাত্র ২ দিন পূর্বে গত ২০ এপ্রিল সোমবার সকালে উপজেলার বেজগাঁও ইউনিয়ন ৪ নং ওয়ার্ডের হাটভোগদিয়া গ্রামে পরিত্যক্ত একটি ভীটা বাড়িতে আম গাছের ডালের সাথে গামছা দিয়ে ঝুলন্ত মারুফ খা (২৫) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে লৌহজং থানা পুলিশ। সে উপজেলা বেজগাঁও ইউনিয়ন হাটভোগদিয়া গ্রামের পশ্চিমপাড়া নূরু বেপারীর বাড়ির পাশে রতন দাসের পরিত্যক্ত ভীটা বাড়িতে আম গাছের ডালের সাথে গামছা দিয়ে ফাস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করে লৌহজং থানা পুলিশ।

পুলিশও এলাকাাসী জানায়, নিহত মারুফ খা একজন মাদক সেবী ছিল। নেশার জন্য মায়ের কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে সে গাছের সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। তারও পূর্বে গত ১৮ মার্চ ঋনের বোঝা সইতে না পেরে গলায় মাফলার পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে লৌহজংয়ে ক্ষুদ্র রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন (৪৫)। উপজেলার বৌলতলী ইউনিয়নের নওপাড়া বাজার সংলগ্ন উদয় কোল্ডস্টোরের সামনে গলায় মাফলার পেচানো অবস্থায় তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে থানা পুলিশ। ওই দিন সাহরির সময় ছেলে ও দেলোয়ার এক সাথে সাহরি খেয়েছে। এরপর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে স্থানীয়রা পুলিশকে জানালে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। পরিবারের সাথে অলাপ করে প্রথমিকভাবে জানা যায় ঋণগ্রস্ত থেকেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় দেলোয়ার। তবে স্থানীয়রা জানায় দেলোয়ারের জুয়া খেলা অভ্যাস ছিল। জুয়া খেলে সে ঋনগ্রস্ত হয়ে হয়ে পড়ে। পাওনাদারদের চাপ সহ্য করতে না পেরে সে আত্মহত্যা করে।

অপর দিকে গত ৪ এপ্রিল শনিবার আত্মহত্যা চেষ্টাকরী এক যুবককে জীবিত উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। ওই দিন ভোররাত প্রায় ৪টার দিকে উপজেলার উত্তর মেদিনীমন্ডল গ্রামের এ ঘটনা ঘটে। উদ্ধারে পর পুলিশের মাধ্যমে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে তিনি দ্বিতীয় দফায় সে অনুরূপ ঘটনা ঘটায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে জলিল ব্যাপারী (৪০) নামের নামে ওই ব্যক্তি শ্বশুর বাড়ির পাশে একটি গাছের ডালে গলায় রশি বেঁধে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। সে গাছের ডালের সঙ্গে রশি বেঁধে ঝুলে পড়ার প্রস্তুতি নিলে স্থানীয় লোকজন তাকে নামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে তারা ৯৯৯- এ ফোন করে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতা চান। খবর পেয়ে শ্রীনগর ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কৌশলে তাকে বোঝানোর মাধ্যমে গলা থেকে ফাঁসের রশি খুলে নিরাপদে উদ্ধার করে। পরে তাকে উদ্ধার করে পদ্মা সেতু উত্তর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সে লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ইউনিয়নের আব্দুর রাজ্জাক বেপারীর পুত্র। বর্তমানে সে কুমারভোগ পদ্মা সেতু পূর্ণবাসন কেন্দ্রে বসবাস করে। তার শ্বশুর বাড়ি আধা কিলোমিটার দূরে উত্তর মেদিনী মন্ডল গ্রামে।

পদ্মা সেতু উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন জানিয়েছেন, জলিল বেপারী নামের ওই ব্যক্তি একজন মাদকাশক্ত ব্যক্তি। সে মাদক নিতে নিতে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। শনিবার ভোর রাতে শ্বশুর বাড়িতে ঝগড়া করে সে গলায় ফাস দিতে যায়। আমরা ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করে তার ভাই ও ভাবির কাছে ভুঝিয়ে দেই। এবং তাকে মাদকাশক্ত পূর্ণবাসন কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করাতে বলি। কিন্ত সকাল ১০ দিকে তিনি আবারও শ্বশুর বাড়ির কাছে গিয়ে একই ঘটনার পূণরাবৃত্তি করে। তার তার স্বজনদের খবর দিয়েছে। তারা এসে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হবে।

লৌহজং থানার ভারপ্রপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, এসকল আত্মহত্যার কথা সবীকার করে বলেন, সামাজিকঅবক্ষয়, নেশা ও পারিবারিক ঝগড়ার কারণেই এসকল আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে নেশাগ্রস্তরা নেশার জন্য টাকা না পেয়ে পরিবারের সাথে ঝগড়া করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এলাকবাসীর উচিৎ এখনই তাদের সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হওয়া। নতুবা এসকল যুবক লোকদের মত যদি উঠতি বয়সের তরুনরা ঝুকে পরে তবে আমাদের সমাজের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই এদেরকে রক্ষার জন্য পরিবার থেকেই প্রথক উদ্যোগ নিতে হবে।

(এমকে/এসপি/এপ্রিল ২৩, ২০২৬)