নারী শিক্ষক লাঞ্ছিত, আমাদের সকলের অপমান
আবদুল হামিদ মাহবুব
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়। এটি নিরাপত্তা, সম্মান ও মানবিকতার ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ থাকা জরুরি। বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের জন্য। কারণ তারা এখনও বহু ক্ষেত্রে বৈষম্য ও ঝুঁকির মুখে থাকেন।
সম্প্রতি রাজশাহীর একটি সরকারি কলেজে নারী শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা, মারধরের ঘটনা আমাদের আবারও ভাবতে বাধ্য করেছে। অভিযুক্ত একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। যিনি প্রতিষ্ঠানের কোনভাবে যুক্ত কিনা, সেটা জানি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার কান্ডের ফুটেজ দেখে আমরা ধারণা নিয়েছি, তিনি ক্ষমতাবান। যদিও তার দল ইতোমধ্যে তাকে বহিষ্কার করেছে। তারপরও বলতে হবে এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এটি একটি গভীর সমস্যার প্রতিফলন।
নারী শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেন না। তারা শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখান। তারা একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। অথচ সেই মানুষদেরই যদি অপমান সহ্য করতে হয়, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত কেঁপে ওঠে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রথম শর্ত হওয়া উচিত নিরাপত্তা। শারীরিক নিরাপত্তা। মানসিক নিরাপত্তা। পেশাগত নিরাপত্তা। নারী শিক্ষক যেন নির্ভয়ে ক্লাস নিতে পারেন। অফিসে বসতে পারেন। মতামত দিতে পারেন। এই নিশ্চয়তা দিতে হবে প্রতিষ্ঠানকেই।
তারপর যেটা বেশি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, সম্মানের পরিবেশ দরকার। নারী শিক্ষককে সহকর্মী হিসেবে দেখা উচিত। তাকে কোনোভাবে হেয় করা চলবে না। তার ব্যক্তিগত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। এমনকি মতভেদ হলেও তা হতে হবে শালীন।
আমি মনে করি শিক্ষাঙ্গন থাকবে সকল প্রভাবমুক্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রদর্শনের জায়গা নয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকেন। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। এর ফল ভোগ করেন শিক্ষকরা। বিশেষ করে নারী শিক্ষকরা।
সাম্প্রতিক ঘটনায় আমরা সেটাই দেখেছি। একজন নারী শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। এটি পুরো শিক্ষক সমাজের ওপর আঘাত। এটি নারী মর্যাদার ওপর আঘাত।
এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটে? কারণ জবাবদিহিতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়। কখনও নেওয়াই হয় না। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এই চক্র ভাঙতে হবে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অপরাধী যেই হোক, তার বিচার হতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ঢাল হতে পারে না।
প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ ব্যবস্থা থাকা দরকার। নারী শিক্ষকরা যেন সহজে অভিযোগ করতে পারেন। তাদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া লিঙ্গ সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশিক্ষণ দরকার। শিক্ষক, কর্মচারী, পরিচালনা কমিটির সদস্য—সবার জন্য। তারা যেন বুঝতে পারেন কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়।
শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তারা যেন শিক্ষককে সম্মান করতে শেখে। বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের প্রতি আচরণে যেন সংবেদনশীল হয়। গণমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে। এসব ঘটনা তুলে ধরতে হবে। কিন্তু দায়িত্বশীলভাবে। ভুক্তভোগীর সম্মান রক্ষা করে। একই সঙ্গে সমাজকে সচেতন করতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে। লঙ্ঘন হলে শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন নারী শিক্ষক শুধু একজন কর্মী নন। তিনি একজন মা, একজন পথপ্রদর্শক, একজন নাগরিক। তাকে অপমান করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎকে অপমান করা।
সাম্প্রতিক কলেজের ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে নিতে হবে।প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে। তাদের পরিবেশ কতটা নিরাপদ? নারী শিক্ষকরা কতটা স্বস্তিতে আছেন? এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজতে হবে।
পরিবর্তন সম্ভব। যদি আমরা চাই। যদি আমরা নীরব না থাকি। যদি আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। নারীর সম্মান রক্ষা করা কোনো দয়া নয়। এটি ন্যায়। এটি অধিকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
