স্বাধীন মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, যশোর : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ছাত্র-জনতার চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশে ষড়যন্ত্র করে উন্নয়ন ও দেশ গড়ার কাজ থামানো যাবে না। তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “আওয়ামী লীগের ভূত এখন অন্য একটি দলের কাঁধে চেপেছে। যখন আমরা মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যস্ত, তখন একটি গোষ্ঠী পর্দার আড়ালে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে গোপন বৈঠক করে ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে লাভ নেই, দেশের মানুষ তাদের চিনে ফেলেছে।”

আজ সোমবার যশোর জেলা বিএনপি আয়োজিত ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানের বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে আজ গোটা যশোর জেলা উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ৫ আগস্ট পরবর্তী ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বিএনপি সংসদে পাস করবে। বিগত ১৭ বছরে শুধু যশোরেই ৬৮ জন শহীদ হয়েছেন, সারাদেশে কয়েক লাখ মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের এই ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল গণভোটের রায় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা স্বৈরাচারকে ক্ষমা করার কথা বলে, তারা মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ভিন্ন খাতে নিতে চায়।

দেশের নারী সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী একগুচ্ছ নতুন ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, মা-বোনদের রান্নার কষ্ট লাঘবে সরকার এখন থেকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর পাশাপাশি ‘এলপিজি কার্ড’ প্রদান করবে। এর মাধ্যমে সাধারণ পরিবারগুলো সুলভে গ্যাস সুবিধা পাবে। এছাড়া নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে মেয়েদের স্নাতক (ডিগ্রি) পর্যন্ত পড়াশোনা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করার ঘোষণা দেন তিনি।

সকালে শার্শা উপজেলার উলাশী-যদুনাথপুর এলাকায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহাসিক ‘উলশী খাল’ (স্থানীয়ভাবে জিয়া খাল নামে পরিচিত) পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী ৫ বছরে সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এর ফলে সেচ সুবিধা বাড়বে, জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং মৎস্য চাষের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে ১২ লক্ষ কৃষকের কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।

দুপুরে যশোর মেডিকেল কলেজ চত্বরে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য কেবল চিকিৎসা নয়, বরং মানুষকে সুস্থ রাখা। সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিতের পাশাপাশি আমরা ‘প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ মডেলে কাজ করতে চাচ্ছি। গুরুতর রোগীদের প্রয়োজনে সরকারি খরচেই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, এটি যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, যার মাধ্যমে দীর্ঘ ১৭ বছর পর যশোরের স্থবির উন্নয়ন চাকা পুনরায় সচল হলো।

সকাল ১০টায় বিশেষ বিমানে যশোর বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় হাজারো জনতা। দিনভর কর্মসূচিতে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

বিকেলে জনসভা আগে প্রধানমন্ত্রী যশোর ইনস্টিটিউটের পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন এবং জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে মতবিনিময় করেন। জনসভার সমাপ্তিতে তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে বলেন, আমরা কোনো বায়বীয় টিকিট বিক্রি করতে চাই না; আমাদের প্রতিশ্রুতি একটিই—করবো কাজ, গড়বো দেশ।

(এসএ/এসপি/এপ্রিল ২৭, ২০২৬)