আশাশুনিতে জমি নিয়ে বিরোধ
বাড়িঘর ভাঙচুর শেষে একই পরিবারের চার নারীসহ ছয়জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষরা বাড়ি ঘরে হামলা ও ভাঙচুর শেষে একই পরিবারের চারজন নারীসহ ছয়জনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করেছে। সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ঝিকরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত তিনজনকে খুলনা ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চারজনকে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
আশাশুনি উপজেলার ঝিকরা গ্রামের মনোরঞ্জন মণ্ডল জানান, ৪৭ শতক ভিটা জমি নিয়ে তাদের সাথে প্রতিপক্ষ গোবিন্দ মণ্ডল, সুরঞ্জন মণ্ডল, শম্ভু মণ্ডলসহ কয়েকজনের ১৯৮৮ সাল থেকে বিরোধ রয়েছে। ওই জমি তার (মনোরঞ্জন) নামে বর্তমান হাল রেকর্ড হলেও জোরপূর্বক দাবি করে আসছিলো তার শরিক সুরঞ্জন মণ্ডলসহ অন্যরা। এ নিয়ে প্রতিপক্ষরা ১৯৮৮ সালে আশাশুনি উপজেলা আদালতে মামলা করে। ১৯৯৫ সালে রায় তারে বিপক্ষে গেলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করে তারা। সেখানে হেরে যাওয়ায় ২০০৮ সালে মহামান্য হাইকোর্টে আপিল করে তারা। বর্তমানে ওই জমির উপর স্থিতাবস্থা জারির নির্দেশ থাকলেও প্রতিপক্ষরা বিভিন্ন অজুহাতে তাদের জমি দখল ও পুকুরের মাছ লুটপাট করে আসছিলো। স্থানীয়ভাবে কয়েকবার শালিসি বৈঠক হলেও তারা সে সিদ্ধান্ত মানেনি। এমনকি ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল আশাশুনি থানায় উভয়পক্ষকে নিয়ে বসাবসি করে ১০ জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে আপোষনামা তৈরি হলেও ২৮ এপ্রিল দুটি গরু উঠানে যাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ গোবিন্দ মণ্ডল, সাগরমণ্ডলসহ কয়েকজন পুত্রবধূ রিতা রানী মণ্ডল, শিখা রানী মণ্ডলকে পিটিয়ে জখম করে। ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি পুতনী পুজা মণ্ডলকে পিটিয়ে জখম করে। এসব নিয়ে থানায় মামলা না হওয়ায় প্রতিপক্ষরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
মনোরঞ্জনমণ্ডল আরো জানান, সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে প্রতিপক্ষ গোবিন্দ মণ্ডল, সুরঞ্জন মণ্ডলসহ তাদের পরিবারের ৮/১০ জন তাদের দখলীয় ও রেকডীয় জমিতে ঢুকে কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে থাকে। বাধা দেওয়ায় তার ছেলে পলাশ মণ্ডলকে দা, লোহার রড ও কোদাল নিয়ে ধাওয়া করে গোবিন্দ, সুরঞ্জন, শম্ভু, কালিপদ, সুভাষ, চিত্তরঞ্জন , মিলন, তারামনি, কমলা, ফুলমতি ও কবিতা মণ্ডলসহ কয়েকজন। পলাশ দৌড়ে ঘরের ভিতর ঢোকার চেষ্টা করলে হামলাকারিরা তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে উঠানে এনে মারপিট করতে থাকে। তাকে রক্ষায় এগিয়ে এলে পুতনী কলেজ ছাত্রী সুপ্রিয়া মণ্ডল, কলেজ ছাত্রী পূজা মণ্ডল, পুত্রবধূ শিখা মণ্ডল, রিতামণ্ডল ও পৌত্র ১০ম শ্রেণীর ছাত্র রাজু মণ্ডলকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করা হয়।
এ সময় তাদের ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হওয়ায় শিখা রানী মণ্ডল, পুজা রানীমণ্ডল ও সুপ্রিয়া মণ্ডলকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে সুপ্রিয়া মণ্ডলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলেও তাকে সোমবার রাতে খুলনা সিটি মেডিকেলে ভর্তি করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুরঞ্জনমণ্ডল বলেন, সোমবার দুপুরে পলাশ মণ্ডলসহ অন্যরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মা কবিতা মণ্ডলকে ধরে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার খবর পাই। এরপর তাদের বাড়ির লোকজনকে নিয়ে কবিতা মণ্ডলকে উদ্ধারে গেলে তাদের সঙ্গে হাতহাতি হয়। নিজেদের অস্ত্র নিজেদের গায়ে লেগে জখম হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, তার মাকেও আশাশুনি থেকে মেডিকেলে ভর্তি করা হবে। তবে সোমবার দুপুর আড়াইটায় এ প্রতিবেদক আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে সমগ্র হাসপাতালে খুঁজে কবিতা মণ্ডলকে পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, সুপ্রিয়ামণ্ডল ও শিখা মণ্ডলকে ধারালো জিনিস দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়েছে। তা ছাড়া সুপ্রিয়া, শিখা ও পুজাকে ভারী জিনিস দিয়ে হাত ও পা, পিঠ জখম করা হয়েছে। বার বার বমি হওয়ায় অবস্থার অবনতি হলে সুপ্রিয়াকে খুলনায় ভর্তি করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আশাশুনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শামীম খান সুমিত্রা মণ্ডলসহ কয়েকজনের উপর প্রতিপক্ষের গুরুতর হামলার কথা নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় পঙ্কজ কুমারমণ্ডল বাদি হয়ে সোমবার রাতে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছন। এ ঘটনায় মামলা রেকর্ড করা হবে। গ্রেপ্তার করা হবে আসামীদের।
(আরকে/এসপি/এপ্রিল ২৮, ২০২৬)
