আবদুল হামিদ মাহবুব


গ্রীষ্মকাল চলছে। বর্ষা এখনো পুরোপুরি নামেনি। কিন্তু এই সময়টাতেই হঠাৎ ঝড়, দমকা হাওয়া আর বজ্রসহ বৃষ্টির কারণে আমাদের শহরের আসল চিত্রটা বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই যে শহর পানির নিচে চলে যায়—এটা নতুন কিছু নয়। বরং বছরের পর বছর ধরে আমরা একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি দেখেছি, দেখছি, অনুভব করছি, সহ্য করছি। অবশ্য, মধ্যে কয়েক বছর স্বস্তি ছিলো।

মৌলভীবাজার পৌরসভার পানি নিষ্কাশনের প্রধান ও একমাত্র মাধ্যম কোদালিছড়া। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ ছড়াটিই আজ কার্যত অচল ছিলো। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে পানির প্রবাহ থাকার কথা, সে সময় পানি ছিল স্থির, বদ্ধ। কোথাও কোথাও পানির উপর ভেসেছে পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা। সেই বদ্ধ পানির দুর্গন্ধ আশেপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এটা শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি।

আমি আগেও এ বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলাম। বলেছিলাম, ছড়ার ভাটিতে কয়েকটি অস্থায়ী বাঁধ তৈরি হওয়ার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এই বাঁধগুলো সরানো না হলে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হবে—এই আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেছিলাম, দিয়েছিলাম অনেক ছবি ফেসবুকে। পাশাপাশি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার করুণ অবস্থার কথাও বলেছিলাম। অনেক ড্রেন ময়লা আর প্লাস্টিকে ভরে আছে, কোথাও কোথাও ড্রেনের অস্তিত্বই বোঝা যায় না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব—সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়েছে।

আমার সেই লেখাগুলো শুধু সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন পত্রিকায়ও সেগুলো প্রকাশিত হয়েছিল। ছড়ার ভেতরে জমে থাকা পলিথিন ও আবর্জনার ছবিও আমি শেয়ার করেছিলাম, যেন বিষয়টি সবার চোখে পড়ে। এরপর কিছুটা নড়াচড়া দেখা গিয়েছিল। পৌরসভা কিছু কিছু জায়গায় কাজও করেছিল। কিন্তু সমস্যার মূল জায়গা—ভাটির সেই বাঁধগুলো একই অবস্থাতেই থেকে যায়। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

পরবর্তীতে জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার অত্যন্ত প্রিয়মানুষ মিজানুর রহমান মিজানের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও যুক্ত করে অনুরোধ করেছিলাম, যেন দ্রুত এই বাঁধগুলো অপসারণ করা হয়। কারণ আমরা সবাই জানি, সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে পরে এর মূল্য দিতে হয় অনেক বেশি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সেই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

তার ফল আমরা গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) শেষ রাত ও ভোরের বৃষ্টিতেই দেখলাম। খুব বেশি নয়, তুলনামূলক একটু ভারী বৃষ্টি—আর তাতেই পুরো শহর পানিতে তলিয়ে গেল। রাস্তাঘাট ডুবে গেল, দোকানপাটে পানি ঢুকল, অসংখ্য পরিবারের ঘরে পানি প্রবেশ করল। মানুষের নিত্যদিনের জীবন থমকে গেল। কারো ব্যবসার ক্ষতি হলো, কারো ঘরের আসবাব নষ্ট হলো, কারো জীবনের সঞ্চয় পানিতে ভেসে গেল। গত বছরও (২০২৫ সালে) এমন হয়েছিল।

প্রশ্ন হলো, এই ক্ষতির দায় কে নেবে? প্রতি বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কি আমাদের মেনে নেয়া উচিত? আমরা কি কেবল ভুক্তভোগী হয়েই থাকব, নাকি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য জোরালো পদক্ষেপ নেব?

বাস্তবতা হলো, আমাদের শহরে এখন কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত আমাদের যে মেয়র ছিলেন ফজলুর রহমান, তিনি ২০১৮ সালে কোদালিছড়া সংস্কার করেছিলেন। তার সময়কালে মৌলভীবাজার পৌরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে তেমন আর পড়তে হয়নি। তিনি কোদালিছড়া রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৌর নাগরিকদের হোল্ডিং ট্যাক্সের সাথে দুই ভাগ হারে অতিরিক্ত চার্জ নির্ধারণ করেছিলেন। সেটা থেকে বছরে প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা আসতো। ওই টাকা দিয়ে প্রতিদিন কোদালিছড়ার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লোক নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু পট পরিবর্তনে সেটা হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু পৌর নাগরিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া তো বন্ধ হয়নি। সেই টাকাটা যাচ্ছে কোথায় এখন?

এই কথাগুলো বলায় কেউ কেউ আমাকে ফজলুর রহমানের পক্ষের লোক বলতে পারেন। আমার কিন্তু কোন রাজনীতি নেই। ফজলুর রহমান আওয়ামী লীগ করতেন। তিনি সেই দলের নেতা ছিলেন। তিনি যে ভালো কাজগুলো করেছেন, আমি তার প্রশংসা অবশ্যই করবো। যেমন প্রশংসা করি এই পৌরসভার ফুটপাত নির্মানের পথপ্রদর্শক বিএনপি নেতা ফয়জুল করিম ময়ূন। তিনি যখন মেয়র হয়েছিলেন, শহরে ফুটপাতগুলো তার হাত দিয়েই হয়েছে।

আমি ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট খুনি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি এখনো তার বিরুদ্ধে লেখালেখি অব্যাহত রেখেছি। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই আকাম-কুকাম করেছেন। লুটপাট করেছেন। সেগুলো নিয়ে তখনো বলেছি, এখনো বলি। আওয়ামী লীগের সকলে মন্দ ছিল, সেটা আমি বলবো না। যার যেটুক ভালো ছিল, সেটাও বলবো। এই জলাবদ্ধতা নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি ফজলুর রহমানের কিছু প্রশংসাই করলাম। এ কারণে আমাকে যার যা খুশি ট্যাগ দিতে পারেন, আমার তাতে কিচ্ছু আছে আসে যায় না। আমি কখনো কোন দলের নয়। আমার কোন রাজনীতি নেই। আমার সকল লেখালেখি বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষের জন্য।

এখন জনপ্রতিনিধি নেই, সে কারণে পৌরবাসীর কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করে কেউ দাঁড়াচ্ছেন না। আগামীতে পৌরসভার মেয়র হওয়ার জন্য কারো কারো নাম প্রচার হতে দেখি। কিন্তু তাদের কাউকেও এই সময়ে মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে দেখিনা! প্রশাসনের লোক এখন পৌরসভা চালাচ্ছে। প্রশাসনের লোকের উদ্যোগ আন্তরিকতা পূর্ণ হয় না, যে কারণে উদ্যোগ নিলেও তা যথেষ্ট দ্রুত বা কার্যকর দেখিনা। কিন্তু একটি শহর তো এভাবে চলতে পারে না। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলোর একটি হলো নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ, যেখানে বৃষ্টির পানিতে জীবন থেমে যাবে না।

এখনই সময়, আমরা সবাই মিলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখি। কোদালিছড়াকে সচল করতে হবে। ভাটির বাঁধগুলো দ্রুত অপসারণ করতে হবে। নিয়মিতভাবে ছড়া পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। শহরের প্রতিটি ড্রেন পরিষ্কার ও সংস্কার করতে হবে। প্লাস্টিক ও আবর্জনা যেন ড্রেনে না পড়ে—সেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

শুধু প্রশাসনের ওপর দায় চাপিয়ে দিলেই হবে না। নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব আছে। আমরা যদি নিজেরাই ড্রেনে ময়লা ফেলি, তাহলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। তাই সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ—এই তিনটিই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

গত রাতের ঘটনা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনো সময় আছে, আমরা চাইলে পরিস্থিতি বদলাতে পারি। নইলে আগামী বর্ষায় এই দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে—এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আসুন, আমরা সবাই মিলে দাবি তুলি—আমাদের শহরকে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ একটি শহর শুধু রাস্তা-ঘাট বা ভবনের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, জীবন আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

এই লেখাটি পড়ে অনেকেই গালমন্দ করতে পারেন। বলবেন গতকালকে যেভাবে বৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা হওয়াটাই স্বাভাবিক। দেশের অনেক এলাকায় এমন হয়েছে। সেটা হতেই পারে। কিন্তু আমাদের পৌরসভার ভেতরে যে জলাবদ্ধতা হলো সেটা কিন্তু পূর্ব প্রস্তুতি না নেওয়া ও অবহেলার কারণে হয়েছে বলে আমি মনে করি। সে কারণে আমাকে এত বড় একটি লেখা লিখতে হল। যারা কষ্ট করে লেখাটি পড়বেন সবার জন্য শুভকামনা।

এই লেখার সাথে আমি দুটি ছবি দিলাম। একটি ছবি আমাদের বিগত মেয়রের কার্যকালীন। আমার মোবাইলে সংগ্রহে ছিলো। আর আরেকটি আজকের। অন্যদের তোলা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।