উচ্চশিক্ষা রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে: কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
দেলোয়ার জাহিদ
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, মান-নিশ্চিতকরণে দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিলুপ্ত করে ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং একটি সম্ভাব্য নীতিগত রূপান্তর, যা দেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের ভিত্তি হতে পারে।
প্রস্তাবিত কমিশনের র্যাংকিং ব্যবস্থা, মানোন্নয়নে তদারকি, এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও একাডেমিক কার্যক্রমে শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা—সবই একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে নির্দেশনা অমান্য করলে অর্থায়ন স্থগিত বা প্রোগ্রাম বাতিলের ক্ষমতা জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এই ক্ষমতার প্রয়োগ কতটা স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবমুক্ত থাকবে?
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বদলে বিকেন্দ্রীভূত, স্বশাসিত ও বহুমাত্রিক কাঠামো কার্যকর হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত কমিশনকে কেবল ক্ষমতাবান করলেই চলবে না; বরং এটিকে হতে হবে স্বাধীন, ডেটা-নির্ভর এবং অংশীজন-সম্পৃক্ত। অন্যথায় এটি ইউজিসির মতোই আরেকটি আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানোন্নয়ন কেবল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন গবেষণা-উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিস্তার। প্রস্তাবিত কমিশনের কাঠামোয় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
অতএব, উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন একটি সাহসী পদক্ষেপ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—প্রথমত, প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা; দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কার্যপ্রণালী; এবং তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চায়, তবে এই রূপান্তরকে কাগুজে পরিকল্পনার বাইরে এনে কার্যকর বাস্তবতায় রূপ দিতে হবে।
লেখক :মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক।
