মে দিবস পালন, শ্রমিকের লাভ কতটুকু
আবদুল হামিদ মাহবুব
পহেলা মে। বিশ্ব শ্রমিক দিবস। দিনটি এলে রাস্তায় মানুষ নামে। ব্যানার ওঠে। স্লোগান শোনা যায়। প্রতিশ্রুতি ভেসে বেড়ায়। সংবাদমাধ্যমে ছবি ছাপা হয়। টকশোতে কথা বাড়ে। প্রশ্ন ওঠে; এর ভেতরে শ্রমিকের লাভ কতটুকু? এই প্রশ্ন নতুন নয়। প্রতি বছরই ফিরে আসে। আবার চাপা পড়ে যায়। তবু উত্তর খোঁজা দরকার। কারণ শ্রমিকই অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাদের জীবনযাত্রা বদলালে দেশ বদলায়।
বাংলাদেশে এই দিনে নানা মতের সংগঠন কর্মসূচি দেয়। বামপন্থীরা মিছিল করে। ডানপন্থীরা সমাবেশ করে। ইসলামপন্থীরাও বক্তব্য রাখে। গার্মেন্টস, পরিবহন, নির্মাণ, সব খাতের সংগঠন সক্রিয় হয়। দাবির তালিকা দীর্ঘ হয়। ন্যায্য মজুরি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ। কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ। সামাজিক সুরক্ষা। ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা। তালিকা বদলায় না। ভাষা বদলায়।
কিন্তু বাস্তব কতটা বদলায়? প্রথমে কর্মসূচির কথায় আসি। এই কর্মসূচি শ্রমিকদের কণ্ঠকে দৃশ্যমান করে। সেটাই বড় অর্জন। অনেক সময় নীরব কষ্ট দৃশ্যমান হয় না। মিছিল সেটাকে সামনে আনে। সংবাদমাধ্যম বাধ্য হয় দেখাতে। নীতিনির্ধারকের টেবিলে বিষয়টি ওঠে। এই দিক থেকে লাভ আছে। কিন্তু এখানেই সীমা টেনে দিলে ভুল হবে। কর্মসূচি যদি কেবল আনুষ্ঠানিক থাকে, লাভ কমে যায়। একদিনের উত্তেজনা। পরদিন স্বাভাবিকতা। এই চক্র ভাঙতে না পারলে ফল টেকসই হয় না। অনেক সংগঠন এই ফাঁদে পড়ে। স্লোগান জোরালো। সংগঠন দুর্বল। মাঠে লোক থাকে। আলোচনায় ধার কম।
ক্ষমতাসীনদের প্রতিশ্রুতির কথাও আসে। দিবস এলে প্রতিশ্রুতি বাড়ে। মজুরি বাড়ানোর আশ্বাস। কল্যাণ তহবিল। আবাসন প্রকল্প। স্বাস্থ্যসেবা। প্রশিক্ষণ। শুনতে ভালো লাগে। প্রশ্ন হলো; বাস্তবায়ন কতটা? এখানে বাস্তবতা কঠিন। নীতির ঘোষণা আর বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক থাকে। বাজেট লাগে। প্রশাসনিক সক্ষমতা লাগে। রাজনৈতিক অগ্রাধিকার লাগে। অনেক সময় ঘোষণা থাকে, বাস্তবায়ন ধীর হয়। কখনো আটকে যায়। কখনো আংশিক হয়। ফলে শ্রমিকের জীবনে পরিবর্তন দেরিতে আসে।
তবু পুরো চিত্র একরঙা নয়। কিছু অগ্রগতি হয়েছে। মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। কিছু খাতে ন্যূনতম মজুরি বেড়েছে। কারখানার নিরাপত্তায় নজর বেড়েছে। শ্রম আদালত আছে। ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ছে। এগুলো ছোট পদক্ষেপ। কিন্তু এগুলোও সংগ্রামের ফল। তাই প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি খালি নয়। তবে নিশ্চয়তা নেই। শ্রমিক নেতাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা দাবি তোলেন। পথ দেখান। আলোচনা করেন। কখনো আন্দোলন ডাকেন। পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে কৌশল বলেন। আইনি পথের কথা বলেন। সংগঠিত হওয়ার কথা বলেন। এগুলো দরকারি। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থাকে। নেতৃত্ব কতটা জবাবদিহিমূলক? কতটা স্বচ্ছ? শ্রমিকের সঙ্গে কতটা সংযোগ আছে? অনেক সময় নেতৃত্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দলীয় রাজনীতির প্রভাব বাড়ে। তখন শ্রমিকের স্বার্থ আড়ালে যায়। এই ঝুঁকি বাস্তব।
আশার জায়গা কোথায়? যদি শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে দরকষাকষি করে, তখন মালিকপক্ষ শুনতে বাধ্য হয়। আইনি লড়াইও সহজ হয়। তাই সংগঠন গড়া জরুরি। কিন্তু সেটা হতে হবে গণতান্ত্রিক। সদস্যদের মতামত গুরুত্ব পাবে। নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। শ্রমিকরা সঠিক তথ্য পেয়ে নিজেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শ্রমিকরা যদি নিজেদের অধিকার জানেন, তারা দাবি তুলতে পারেন। অনেক শ্রমিক আইনি অধিকার জানেন না। চুক্তি পড়েন না। ওভারটাইমের হিসাব বোঝেন না। এই ঘাটতি দূর করতে হবে। এরজন্য নেতৃবৃন্দ দায়িত্ব নিয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষিত করতে হবে।
আমাদের দেশে শ্রম আদালত আছে। তবে এর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি পথ বের করতে হবে। পরিদর্শন ব্যবস্থাকে শক্ত করতে হবে। দুর্নীতি কমাতে হবে। অভিযোগ করার নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। শ্রমিক অসুস্থ হলে কী হবে? কাজ হারালে কী হবে? বয়সে ভাতা আছে কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট নয়। একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো দরকার। স্বাস্থ্য বীমা। বেকার ভাতা। পেনশন। এগুলো জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যয় থেকে নীতি প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করতে হবে।
শ্রমিকদের যারা খাটান, সব মালিক একরকম নন। কেউ এগিয়ে আসেন। কেউ পিছিয়ে থাকেন। ভালো চর্চাকে উৎসাহ দিতে হবে। খারাপ চর্চাকে শাস্তি দিতে হবে। সাপ্লাই চেইনের চাপও কাজে লাগানো যায়। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা মানদণ্ড চাপিয়ে দেয়। সেটাকে কাজে লাগাতে হবে, কিন্তু শ্রমিকের কণ্ঠকেও সামনে রাখতে হবে। শ্রমনীতি কেবল দিবসের বিষয় নয়। সারা বছরের বিষয়। সংসদে আলোচনা দরকার। বাজেটে বরাদ্দ দরকার। নীতির ধারাবাহিকতা দরকার। প্রতিশ্রুতি দিলে তার রোডম্যাপও দিতে হবে।
এখন প্রশ্ন; এই বছরের কর্মসূচি থেকে শ্রমিকরা কতটা পেলেন? তাৎক্ষণিকভাবে খুব বেশি নয়। মজুরি রাতারাতি বাড়ে না। কর্মঘণ্টা একদিনে কমে না। কিন্তু কিছু অর্জন আছে। ইস্যুগুলো সামনে এসেছে। নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু প্রতিশ্রুতি এসেছে। কিছু দরজা খুলেছে। এটুকু মূল্য আছে। আর দীর্ঘমেয়াদে লাভ নির্ভর করবে পরবর্তী কাজের উপর। কর্মসূচির পর কী হলো? আলোচনা চলল কি? কমিটি বসল কি? খসড়া নীতি তৈরি হলো কি? বাজেটে কিছু এল কি? আদালতে মামলা এগোল কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই আসল ফল।
শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য থেকেও একই কথা। কৌশল ভালো হলে ফল আসে। কিন্তু কৌশল বাস্তবায়ন চাই। মাঠে সংগঠন চাই। আইনি লড়াইয়ে ধৈর্য চাই। সমঝোতায় দক্ষতা চাই। কেবল বক্তব্যে কাজ হয় না। কারণ পরিবর্তন ধীরে আসে। গত এক দশকে কিছু উন্নতি হয়েছে। সামনে আরও হতে পারে। তবে অন্ধ আশাবাদ নয়। চাপ বজায় রাখতে হবে। জবাবদিহি চাইতে হবে। তথ্যভিত্তিক আলোচনা করতে হবে।
পহেলা মে কেবল একদিন নয়। এটি একটি স্মরণ। সংগ্রামের ইতিহাসের স্মরণ। বর্তমানের হিসাব। ভবিষ্যতের রূপরেখা। এই তিনটি যদি একসঙ্গে ধরা যায়, তবেই দিবসটি অর্থবহ হয়। শ্রমিকের লাভ তখনই বাড়বে, যখন প্রতিশ্রুতি কাগজ ছাড়িয়ে জীবনে নামবে। যখন মজুরি সময়মতো হাতে আসবে। যখন কারখানা নিরাপদ হবে। যখন অসুস্থ হলে চিকিৎসা মিলবে। যখন মত প্রকাশে ভয় থাকবে না। আমার বিবেচনায় সকল কিছুই সম্ভব যদি রাষ্ট্র কার্যকর থাকে। তাই শেষ কথাটা হচ্ছে কার্যকর রাষ্ট্র চাই।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
