সাংবাদিক চাটুকার হলে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়
আবদুল হামিদ মাহবুব
দিবসের প্রবর্তন হয়েছে। আমাদের দেশেও এই দিবস পালন হয়। দিবসটি নিয়ে কথাবার্তা হয়। আমরা লেখালেখি করি। কিন্তু লাভ কতটুকু হয় জানিনা। বড় লিখলে পাঠকের ধৈর্য্যচুতি ঘটে। তাই লেখাটি ছোট করেই লিখছি।
আজ গণমাধ্যম দিবস। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজে সত্য বলা, তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যম কতটা জরুরি। কিন্তু আমরা কি সত্যিই জানি গণমাধ্যম বলতে কী বোঝায়? আর আমাদের দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন?
গণমাধ্যম বিষয়টা কি? গণমাধ্যমকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়? আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি, তাদের কাছেও বিষয়টা পরিষ্কার নয়। আমি আমার মত করে বলি। আর সেটা হচ্ছে; গণমাধ্যমের সংজ্ঞা খুব সহজ। যেসব মাধ্যমের মাধ্যমে তথ্য, খবর, মতামত এবং বিনোদন মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেগুলোই গণমাধ্যম। এর মধ্যে পড়ে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এখন এমনকি ইউটিউব বা ব্লগও। অর্থাৎ, যেখানে মানুষের কথা বলা হয়, মানুষের জন্য তথ্য পৌঁছানো হয়—সেই সবই গণমাধ্যমের অংশ। আমার বলা এইসব কথার বাইরেও আমার অনেক সাংবাদিক বন্ধুরা হয়তো ভিন্নভাবে এটাকে সংজ্ঞায়িত করবেন।
কথাগুলো থাকুক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের যাত্রা অনেক পুরোনো। স্বাধীনতার আগে থেকেই সংবাদপত্র মানুষকে সচেতন করার কাজ করেছে। বেঙ্গল গেজেটিয়ার ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলের প্রথম মুদ্রিত পত্রিকা। তারপর আমরা ইতিহাস থেকে জেনেছি সংবাদ ভাস্বর-এর কথা। পাকিস্তান আমলে মুদ্রিত পত্রিকায় বিশাল ভূমিকা রেখেছে স্বাধীনতা পথকে প্রশস্ত করতে। সে কারণে স্বাধীনতার পরও গণমাধ্যম দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে; এই পথ কতটা মসৃণ ছিল?
বাংলাদেশের গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীন, এ কথা বলা কঠিন। আবার একেবারেই স্বাধীন নয়; এ কথাও পুরো সত্য নয়। এখানে এক ধরনের সীমিত স্বাধীনতা আছে। কিছু বিষয় নিয়ে লেখা যায়, কিছু বিষয় নিয়ে বলা যায়, কিন্তু কিছু সংবেদনশীল বিষয় এলে অনেকেই সতর্ক হয়ে যান। কারণ, বাস্তবতা হলো; আইন, রাজনৈতিক চাপ এবং বিভিন্ন প্রভাব অনেক সময় সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধা দেয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে গণমাধ্যমের অবস্থা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। একদিকে উন্নয়নের গল্প এসেছে, অন্যদিকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সাংবাদিক বলেছেন, তারা আগের মতো স্বাধীনভাবে লিখতে পারেন না। বিশেষ করে সরকারবিরোধী বা সমালোচনামূলক খবর প্রকাশ করতে গেলে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ কিছু আইন নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছে, এইসব কথা আমাদের সকল সাংবাদিকই বলেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এর অভ্যুত্থানের পর অবস্থা কিছুটা পাল্টেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর আমি অন্তত বলবো প্রাণ বলে মন খুলে লেখা গেছে, বলা গেছে। এইযে বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি নিয়ে নির্বাচনের পর সেটা কি আর পারছি? হয়তো কেউ কেউ পারছেন, কেউ কেউ পারছেন না, এখানে সেলফ সেন্সর একটি বিষয়টিও আছে। আছে আমরা সাংবাদিকদের নিজেদের রাজনৈতিক দর্শনের বিষয়ও। তবে কিছু গণমাধ্যম এখনো সাহসী ভূমিকা রাখছে। তারা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করছে, দুর্নীতির খবর তুলে ধরছে। কিন্তু সেই সংখ্যা খুব বেশি নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটা “সেফ জোন” ধরে কাজ করার প্রবণতা দেখা যায়।
এই জায়গায় “চাটুকার সাংবাদিকতা” একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন সাংবাদিকতা সত্য বলার পরিবর্তে ক্ষমতাকে খুশি করার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, তখন সত্য চাপা পড়ে যায়। ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা হয় না। জনগণ সঠিক তথ্য পায় না। চাটুকার সাংবাদিকতার কারণে দেশের ক্ষতি কম নয়। সাংবাদিক চাটুকার হলে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। মানুষ গণমাধ্যমকে আর বিশ্বাস করতে চায় না। মেরুদণ্ড সোজা করে কিছু আর লিখতে পারেন না। এর দফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
এখন প্রশ্ন; বর্তমানে সাংবাদিকতা কি স্বাধীন? আংশিকভাবে বলা যায়, কিছুটা স্বাধীনতা আছে। কিন্তু পুরোপুরি স্বাধীন বলা যায় না। এখনও অনেক সাংবাদিক আত্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকেন। অনেকেই ভাবেন, এই খবরটি দিলে সমস্যা হবে কিনা। যদি সাংবাদিকতা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়, তাহলে দেশ কীভাবে লাভবান হয়? আমি জবাব দিই, অবশ্যই লাভবান হয়। মানুষ সঠিক তথ্য পায়। এতে তারা সচেতন হয় এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকার ও ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিতা বাড়ে। তারা জানে, ভুল করলে তা প্রকাশ পাবে। দেশের সবচেয়ে বেশি লাভ হয় দুর্নীতিটা কমে। কারণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতিকে প্রকাশ করে। আরজে লাভ হয় সেটা হচ্ছে, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কারণ, গণমাধ্যম তখন মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠে।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে। এক নম্বরে আমি বলব, আইন করতে হবে যা মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে, ভয় সৃষ্টি করে না। তারপরই যেটা নিশ্চিত করতে হবে সেটা হচ্ছে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা। কোনো সাংবাদিক হুমকি বা হামলার শিকার হলে দ্রুত বিচার হতে হবে। আরো পড়তে হবে সরকারি তথ্য পাওয়ার পথটাকে সহজ। তথ্য অধিকার আইনের নামে তথ্য পাওয়ার জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। গণমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সকল পর্যায়ে থেকে বন্ধ রাখতে।
আমরা সাংবাদিকদেরও দায়িত্ব আছে। স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই লেখা নয়। সত্য যাচাই করা, নিরপেক্ষ থাকা এবং মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া, এগুলোই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। আজ গণমাধ্যম দিবসে আমাদের ভাবতে হবে; আমরা কেমন গণমাধ্যম চাই? এমন গণমাধ্যম, যা শুধু প্রশংসা করবে? নাকি এমন গণমাধ্যম, যা সত্য বলবে, প্রশ্ন করবে, মানুষের পাশে দাঁড়াবে?
একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই পারে একটি দেশকে এগিয়ে নিতে। আর সেই পথ তৈরি করতে হলে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দলগুলো ও জনগণ, এই সকল পক্ষকেই সচেতন হতে হবে। দেশের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
