রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরার শ্যামনগরে এই দিনটি যেন কেবল স্মরণেই সীমাবদ্ধ। এখানে অসংখ্য নারী শ্রমিক প্রতিদিন পুরুষের সমান পরিশ্রম করেও মজুরি পান অর্ধেক। দীর্ঘদিন ধরে এই বৈষম্যমূলক মজুরিতে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। পহেলা মে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকারের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাতক্ষীরার উপকূলের এই নারীরা এখনও ন্যায্য মজুরি, সম্মান ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত।

শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ, ঈশ্বরীপুর, কৈখালী ও ভুরুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়ধানক্ষেত থেকে শুরু করে কাঁকড়া খামার, মাছের ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, এমনকি রাস্তা নির্মাণের কাজেও পুরুষের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন নারীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদে পুড়ে, কাদা-মাটিতে ভিজে তারা কাজ করেন। কিন্তু দিনের শেষে মজুরির হিসেবে দেখা যায় বৈষম্য।

স্থানীয় নারী শ্রমিক আকলিমা খাতুন, সাবিত্রী কয়াল, অলোকা পরমান্যসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজের ধরন ও সময় এক হলেও শুধুমাত্র নারী হওয়ায় তারা কম মজুরি পাচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে এই কম পারিশ্রমিকেই কাজ করছেন, কারণ বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত।

মুন্সিগঞ্জের কলবাড়ি এলাকার জয়ন্ত রপ্তান ও সাহেব আলী জানান, এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত চর্চা, যা এখনও পরিবর্তন হয়নি। ফলে চিংড়ি ঘের, কাঁকড়ার প্রকল্প, ধান খেত, সবজিক্ষেতসহ কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

শ্যামনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর উপজেলার ৩৬টি কৃষি ব্লকে ২ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান এবং ৬০০ হেক্টর জমিতে অন্যান্য সবজি চাষ হয়েছে। এসব এলাকায় চাষাবাদের কাজে নিয়োজিত অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। তুলনামূলক কম মজুরি দেওয়ায় চাষিরা নারী শ্রমিকদের বেশি নিয়োগ দেন। উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব ধানখালী এলাকায় একই ধরনের কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে মজুরিতে স্পষ্ট বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। মাঠে ধান কাটা, রোপণসহ অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পান, সেখানে একই সময় ও সমপরিমাণ পরিশ্রম করেও নারী শ্রমিকদের দেওয়া হয় মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ধান কাটার কাজ করা নারী শ্রমিক শিবানী মন্ডল জানান, স্বামীর আয়ে সংসার চলে না, তাই বাধ্য হয়ে কাজে নামতে হয়। কিন্তু সারাদিন পরিশ্রম করেও পুরুষের অর্ধেক মজুরি পাওয়া তার জন্য কষ্টের। একই কথা বলেন নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম।

তিনি বলেন, "একই সময়, একই কাজ করি। কিন্তু টাকা নিতে গেলে মনে হয় আমরা মানুষ না, আলাদা কিছু।" স্থানীয় চাষি রফিকুল ইসলামও বৈষম্যের বিষয়টি স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, "নারীরা পুরুষদের মতোই কাজ করে। কিন্তু আমরা পুরুষদের ৫৫০ টাকা এবং নারীদের ৩০০ টাকা মজুরি দেই।" উপকূলীয় এই অঞ্চলে পুরুষ শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হওয়ায় কৃষি ও মৎস্য খাতে নারীদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু সেই নির্ভরতার বিপরীতে তারা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্যায়ন। এই বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও।

শ্যামনগর সরকারি মহাসিন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সামিরা আক্তার ও তার সহপাঠীরা জানান, মেয়েরা এখনও পরিবার ও সমাজে পিছিয়ে রয়েছে। তাদের লেখাপড়ার সুযোগ কম, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বেশি। এ ধরনের মজুরিবৈষম্য নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় হতাশ নারী শ্রমিকরা। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর নারী দিবসে সভা ও মানববন্ধনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। এমনকি উপজেলায় কতজন নারী শ্রমিক কাজ করছেন, সে সম্পর্কেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

শ্যামনগর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক বলেন, পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকদের অর্ধেক মজুরি পাওয়া দুঃখজনক। তবে এই বৈষম্য নিরসনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ছাড়া তাদের হাতে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এছাড়া উপজেলায় নারী শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট তথ্যও নেই।

(আরকে/এসপি/মে ০৩, ২০২৬)