আবদুল হামিদ মাহবুব


নিউইয়র্কে নামার আগে জানালার কাঁচে চেয়ে ছিলাম। নিচে  শহরটা যেন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছিল—অজস্র রাস্তা, গাড়ির সারি, আর জ্বলজ্বল করছে রানওয়ে। একটু পরেই আমাদের বিমান নেমে এল জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ-সংক্ষেপে জেএফকে। গতকাল আমি আমেরিকায় এসেছি, হাতে গোনা কয়েকটা দিন কাটাতে ছেলে আর বউমার সঙ্গে। পাশে আছেন ছেলের মা, লতিফা নিলুফার পাপড়ি। বিমানবন্দরে নামার পর কথায় কথায় উঠে এল নিউইয়র্কের প্রসঙ্গ, আর সেই সূত্রে জেএফকে—যার নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক ইতিহাস।

জেএফকে নামটি এসেছে জন এফ. কেনেডি-এর নাম থেকে। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট—একজন তরুণ, উদ্যমী নেতা, যিনি ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেন। তাঁর সময়ে 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস'-এর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল, যেখানে পৃথিবী প্রায় পারমাণবিক যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। কেনেডির নেতৃত্বে সেই সংকট কূটনৈতিকভাবে সমাধান হয়, যা আজও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

কিন্তু এই উজ্জ্বল অধ্যায় হঠাৎ করেই থেমে যায়। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর, ডালাস শহরে এক মোটরকেডে যাওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হন। এই ঘটনা—জন এফ. কেনেডি হত্যাকাণ্ড—পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আজও তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা বিতর্ক ও তত্ত্ব প্রচলিত আছে।

একটু ঘাটাঘাুটি তরে জানলাম, জেএফকে বিমানবন্দরটি প্রথম চালু হয় ১৯৪৮ সালে, তখন এর নাম ছিল “আইডলওয়াইল্ড এয়ারপোর্ট”। ১৯৬৩ সালে কেনেডির মৃত্যুর পর, তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৬৪ সালে বিমানবন্দরটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

বিমানবন্দরের আকার বিশাল। প্রায় ৫,২০০ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। এখানে একাধিক টার্মিনাল, অসংখ্য রানওয়ে, আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ থেকে ১,২০০টিরও বেশি ফ্লাইট ওঠানামা করে—দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে।

ইমিগ্রেশন পার হয়ে যখন বাইরে এলাম, তখন ঠাণ্ডা বাতাস মুখে লাগল। ছেলে আর বউমা ছুটে এলো। গাড়ির ড্রাইভ করে নিয়ে এসেছে তাদের বন্ধু ইয়োর্গ। গাড়িতে উঠেই ছেলের ঘরের গন্তব্যে রওনা হলাম। সে থাকে পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়াতে। আমার মাথায় তখনও ঘুরছে জেএফকে-এর নাম। একটা মানুষের নাম কত বড় হয়ে গেলে একটা দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তাঁর নামে হয়! সত্যিই তাই। জন এফ কেনেডি শুধু একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক প্রতীক, স্বপ্ন, সাহস, আর পরিবর্তনের প্রতীক। আর সেই কারণেই তাঁর নাম আজও প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।