তিস্তা মহাপরিকল্পনা
আশ্বাসের চেয়ে রোডম্যাপের অপেক্ষায় তিস্তা পাড়ের মানুষ
ওয়াজেদুর রহমান কনক
বাংলাদেশের তিস্তা নদীর সংকট এবং এ নিয়ে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ বর্তমান সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিএনপি সরকার গঠন করার আড়াই মাসের মাথায় নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের তিন দিনের চীন সফর এই অমীমাংসিত সংকটের সমাধানে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ বাস্তবায়নে বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার আলোচনা এখন কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-মরণ ও অস্তিত্বের সাথে মিশে থাকা এই প্রকল্প এবং এর পেছনের ভূ-রাজনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এক মস্ত বড় পরীক্ষা।
তিস্তা মূলত একটি আন্তর্জাতিক নদী, যা হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটির উজানে ভারতের অংশে একাধিক ব্যারেজ ও বাঁধ নির্মাণ করার কারণে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে তীব্র পানিশূন্যতা তৈরি হয়। পানির অভাবে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয় নদীগর্ভ, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীর মতো তিস্তা তীরবর্তী জেলাগুলোর কৃষিকাজে। আবার বিপরীত চিত্র দেখা যায় বর্ষা মৌসুমে; সে সময় ভারতের ব্যারেজগুলো খুলে দেওয়ায় হঠাৎ করে আসা পানির ঢলে তলিয়ে যায় লাখ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলের মাঠ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা আর তীব্র নদীভাঙন অববাহিকার বাসিন্দাদের জীবনকে বছরের পর বছর ধরে দুর্বিষহ করে রেখেছে। দীর্ঘদিন পানির ন্যায্য হিস্যা না পেয়ে স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এই চরম বৈরী পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তিস্তা নদীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় একটি বৃহৎ মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে একটি বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ করা। এর পাশাপাশি ১০২ কিলোমিটার নদী খনন করে গভীরতা বাড়ানো, নদীর দুই তীরে ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করে ভাঙন রোধ করা, প্রায় ১৭১ বর্গকিলোমিটার ভূমি উদ্ধার করা এবং উদ্ধারকৃত ভূমিতে স্যাটেলাইট শহর, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ১৫০ মেগাওয়াটের সৌর বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করে এলাকাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন হাবে রূপান্তর করা। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন, যা শুরু থেকেই ঋণ হিসেবে দিতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল চীন।
চীনের আগ্রহের পেছনে মূল কারণ হিসেবে অনেক বিশ্লেষক তাদের বৈশ্বিক মহাপরিকল্পনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই-কে চিহ্নিত করেন। বেইজিং চাচ্ছে বিআরআই-এর অধীনে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে তাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে যুক্ত করতে। কৌশলগত এই সংযোগের ক্ষেত্রে তিস্তা বহুমুখী প্রকল্পকে চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে বিবেচনা করে। তবে সিকিম ও শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর কাছাকাছি চীনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং প্রভাবকে ভারত চিরকালই নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি ও সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণেই ২০২৪ সালে ভারত নিজেই তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেয়, যা তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকে আরও জটিল ও দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে চীনের জন্য এই প্রকল্পে পুনরায় যুক্ত হওয়ার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সময়ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বেইজিংয়ের সহায়তায় বাস্তবায়নের বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে নির্বাচনের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাদের দল ক্ষমতায় গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নবগঠিত তারেক রহমানের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বেইজিংয়ে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়েই তিস্তা প্রকল্পটিকে আলোচনার মূল টেবিলে স্থান দিয়েছেন।
অবশ্য তিস্তাপাড়ের ভুক্তভোগী মানুষ ও মাঠপর্যায়ের আন্দোলনকারীরা এই সফর ও আলোচনা নিয়ে কিছুটা সংশয়ের মধ্যে রয়েছেন। তাদের মতে, অতীতেও এমন বহু আশার বাণী শোনা গেছে কিন্তু বাস্তব কাজের অগ্রগতি হয়নি। তাই যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হচ্ছে এবং এর বাস্তবায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা হচ্ছে, ততক্ষণ নদীর অববাহিকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষের মনে শতভাগ আশ্বস্ত হওয়া কঠিন। তাছাড়া তারা মনে করেন, মহাপরিকল্পনাটি মূলত বাংলাদেশের ভেতরের একটি নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প মাত্র। এর শতভাগ সুফল পেতে হলে আন্তর্জাতিক নদীর অধিকার অনুযায়ী ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করাও সমান্তরালভাবে জরুরি।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে এবং মমতার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে সেখানে বিজেপি সরকার গঠনের পথ সুগম হয়েছে। এর ফলে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির মুখে আটকে যাওয়া তিস্তার ঐতিহাসিক পানি বণ্টন চুক্তিটি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন কূটনৈতিক জানালা উন্মোচিত হয়েছে বলে অনেকেই ধারণা করছেন। তবে চুক্তির বিষয়ে ভারতের মনোভাব কেমন হবে তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট যে, পানির অধিকার আদায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও নদী ব্যবস্থাপনার নিজস্ব কাজটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিতে চায়। আর সেই লক্ষ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের সাথে অংশীদারিত্ব জোরদার করাকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে করছে ঢাকা।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
