মো. মামুনুর রশীদ


উত্তরা গণভবনের এই ঘড়িটি যেন অতীতের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

নাটোরের ঐতিহাসিক উত্তরা গণভবনের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের এক নীরব প্রহরী, প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো একটি বিশাল যান্ত্রিক ঘড়ি। আধুনিক যুগে যেখানে সময় জানার জন্য মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ঘড়ি কিংবা বিদ্যুৎচালিত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়, সেখানে এই ঘড়িটি এখনও চলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদ্ধতিতে।

বিদ্যুৎ, ব্যাটারি বা কোনো জ্বালানি ছাড়াই এটি বছরের পর বছর নির্ভুলভাবে সময় জানিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১৩ মণ ওজনের এই বিশাল ঘড়িটি উত্তরা গণভবনের প্রধান ফটকের ওপর স্থাপন করা।

এটি একটি ডাবল ডায়াল ঘড়ি, অর্থাৎ দুই দিকে দুটি ডায়াল রয়েছে, যাতে ফটকের দুই দিক থেকেই সহজে সময় দেখা যায়। শুধু সময় দেখানোর মধ্যেই এর বিশেষত্ব সীমাবদ্ধ নয়; ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায় বলে জানা যায়।
এক সময় আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে এই ঘণ্টাধ্বনি গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। এখনও অনেকে ঘণ্টাধ্বনি শোনার জন্য উত্তরা গণভবন অথবা এর আশপাশে এসে বসে থাকেন।

এই ঘড়ির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর চালিকাশক্তি। ঘড়িটি পরিচালিত হয় মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে। এক পাশে আট মণ এবং আরেক পাশে পাঁচ মণ ওজনের দুটি পাথরের ভারে চলে ঘড়িটি। ভেতরে থাকা পাথরের ভারী ওজন ধীরে ধীরে নিচে নামতে নামতে যান্ত্রিক শক্তি উৎপন্ন করে, যা ঘড়ির কাঁটা সচল রাখে। একবার চাবি দিলে ঘড়িটি টানা সাত দিন চলতে পারে। তাই প্রতি সপ্তাহে একবার করে এটিকে চাবি দিতে হয় বলে জানান উত্তরা গণভবনে দায়িত্বরত হিসাব সহকারী ও তত্ত্বাবধায়ক নুর মোহাম্মদ।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে নাটোর রাজবাড়ির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। পরে রাজা প্রমোদনাথ রায় রাজপ্রাসাদটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে চলা পুনর্গঠন কাজের সময় তিনি ইউরোপ থেকে বিশেষভাবে এই ঘড়িটি আনিয়ে স্থাপন করেন। ধারণা করা হয়, ঘড়িটি ইংল্যান্ড অথবা ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে আনা হয়েছিল। তৎকালীন উন্নত প্রকৌশল বিদ্যার নিদর্শন হিসেবে এটি ছিল এক অনন্য উদাহরণ।

বলা যায়, উপমহাদেশে এই ধরনের মেকানিক্যাল ডাবল ডায়াল ঘড়ি অত্যন্ত বিরল। দুই শতাব্দী ধরে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, সবকিছু উপেক্ষা করেও এটি নির্ভুলভাবে সময় জানিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এর রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতিও অনেকের কাছে এখনও রহস্যময়। এই ঐতিহাসিক ঘড়িটির যত্ন নেওয়ার কাজ করে গণপূর্ত বিভাগ। সেখানে নির্দিষ্ট অপারেটররা এটি দেখভাল করে আসছেন। ঘড়ির যান্ত্রিক অংশ সচল রাখতে রক্ষণাবেক্ষণের সময় রাইফেলের তেল ব্যবহার করা হয়। নিয়মিত পরিষ্কার ও যত্নের ফলে শতাব্দী পেরিয়েও এটি এখনও সচল রয়েছে। সময়ের ধারায় অনেক কিছুই বদলে গেছে, কিন্তু উত্তরা গণভবনের এই ঘড়িটি যেন অতীতের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। নাটোরের রাজকীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৌশল কৌশলের এক অনন্য স্মারক হিসেবে এটি আজও মানুষের কৌতূহল ও বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দু।

উত্তরা গণভবনে ঘুরতে আসা শহরের তহুরা বেগম জানান, ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি শুনতে বেশ ভালো লাগে। তাই সুযোগ পেলে উত্তরা গণভবনে এসে ঘণ্টাধ্বনি শোনার জন্য অপেক্ষা করি। তিনি বলেন, দুপুর ১২টার দিকে ১২ বার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়। তাই এ সময়টাতে বেশি আসি। আমার মতো আরও অনেকেই আসেন এবং ঘণ্টাধ্বনি শোনেন। একই কথা বলেন কলেজছাত্র লিমন হোসেন, বিথী দাসসহ আরও অনেকে।

উত্তরা গণভবন-সংলগ্ন স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, ঘণ্টাধ্বনি বাজলেই আমরা সময় বুঝতে পারি। কারণ যখন যে সময়, তখন সেই সংখ্যক বার ঘণ্টা বাজে। এজন্য সময় বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না, আলাদা করে ঘড়ি দেখতে হয় না। ঘণ্টাধ্বনির শব্দ অনেকটাই কমে গেছে।

স্থানীয় শিক্ষক মামুনুর রশীদ বলেন, বাড়ি থেকেই ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়। এতে ভোরে ঘুম ভাঙে, মসজিদে যাই, সময়মতো কাজকর্ম করি। ছোটবেলায় ঘণ্টাধ্বনি শুনেই সময়মতো স্কুলে যেতাম। শিক্ষকরাও সেই অনুযায়ী স্কুল ছুটি দিতেন। এখন এসব শুধুই স্মৃতি। নতুন প্রজন্মের কাছে এটির কদর তেমন একটা নেই, তবে তাদের সময়ের খুব কদর আছে।

সদর উপজেলার ভাতুরিয়া গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি শুকুর আলী জানান, উত্তরা গণভবনের ঘণ্টাধ্বনি আগে সাত থেকে আট মাইল দূর থেকেও শোনা যেত। এখন আর সেই ধ্বনি দূর থেকে শোনা যায় না।

এ বিষয়ে জানতে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যারা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন, তাদের সপ্তাহে একদিন (সোমবার) সঠিক সময়ে চাবি দেওয়ার কথা থাকলেও তারা নির্ধারিত সময়ে চাবি দেন না। এতে মূল সময়ের সঙ্গে উত্তরা গণভবনের ঘড়ির সময় সাত থেকে আট মিনিটের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

নাটোরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফ হোসেন বাংলানিউজকে জানান, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(ওএস/এএস/মে ০৯, ২০২৬)