চৌধুরী আবদুল হান্নান


ছাত্র-জনতার জুলাই- ২৪ আন্দোলনের মাধ‍্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছিল এবং বিজয় উল্লাসের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অনেক স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনও ব‍্যাপক তছনছ ও লুটপাট হয়েছিল। 

জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে এবং স্বৈরাচারী শাসনের ভয়াবহতা তুলে ধরতে গণভবনকে “ জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর” এ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

সিদ্ধান্তটা ছিল অনেকটা তাৎক্ষণিক এবং আবেগ তাড়িত, যুক্তি নির্ভর নয়। আন্দোলনকারীদের খুশি করতে যত দ্রুত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, কাজ তত দ্রুত আগায়নি। বর্তমান পর্যায়ে এসে গণভবন সংস্কার করে জাদুঘর নির্মাণের কার্যক্রম বলতে গেলে থেমে আছে।

বর্তমানে নির্বাচিত সরকার যাচাই বাছাই না করে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত সকল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ‍্যোগ নিবে, তা নিশ্চয়ই নয়।

অনেক রাজনীতিক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনকে জাদুঘরে রুপান্তরের পক্ষে নন, তাদের ভাষ‍্য, গণআন্দোলনে বিগত দিনেও সরকার পতন হয়েছে এবং আগামীতেও হবে না, তা বলা যায় না।

প্রতি ক্ষেত্রেই কি জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করে স্মৃতি স্মারক নির্মাণ যুক্তিসঙ্গত হবে? জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান জানানোর বিকল্প পথ আছে। ধ্বংস না করে নতুন সৃষ্টির মাধ‍্যমে শহীদদের প্রতি সম্মান জানানো যায়। কীর্তিমানদের মৃত‍্যু নেই- এই ভাবনা ধারণ করে স্রদ্ধার সাথে তাদের স্মরণ করতে হবে।

যারা আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস‍্যদের অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনে সরকার তাদের দায়িত্ব নিবে। তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন‍্য আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্নভাবে সরকার এগিয়ে আসবে, আর যারা আন্দোলনে আহত হয়েছেন, তাদের সরকারি খরচে চিকিৎসার ব‍্যবস্থা করা।

অতীতেও জাতির ক্রান্তিকালে যারা ত‍্যাগ স্বীকার করেছেন, শহীদ হয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের স্মরণীয় করে রাখতে স্মৃতি-স্মারক নির্মাণ করা হয়েছে কিন্ত আন্দোলন শেষে প্রতি ক্ষেত্রেই একটি করে স্মৃতি জাদুঘর তৈরি করা হয়নি।

তাছাড়া সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আবদুল গনি রোড থেকে পূরো সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের চিন্তা ভাবনা রয়েছে।

শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের একটি দর্শনীয় স্থান, দেশের প্রত‍্যন্ত অঞ্চল থেকে অনেক মানুষ সংসদ ভবন দেখতে আসেন এবং অনেক বিদেশীরও বিশ্বখ‍্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশায় নির্মিত স্থাপনাটির প্রতি আগ্রহ রয়েছে। এই এলাকাটি পর্যায়ক্রমে আরও দৃষ্টিনন্দন করার দাবি রাখে।

হ‍্যারি পটারস সিরিজের বিখ‍্যাত ব্রিটিশ লেখক জে.কে রাউলিং বলেন, “যে মারা গেছে তার দেখভাল নয়, যে বেঁচে আছে তার দেখভাল কর।”

জীবিত অবস্থায় সম্মান, ভালোবাসা ও সহায়তা দেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কোনো বড় প্রকল্প শুরু করলে, দুর্নীতি পিছে পিছে আসে, আলোচ‍্য স্মৃতি জাদুঘর শুরু থেকেই দুর্নীতির থাবা দৃশ‍্যমান।

জাদুঘরে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন‍্য একেক প্রার্থীর কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা এবং ৬ মাসে আপ‍্যায়ন বিল হিসেবে ১ কোটি টাকার বেশি খরচ দেখানো হয়েছে— এমন তথ‍্য পত্রিকায় এসেছে।

জুলাই গণঅভ‍্যুথ্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মান প্রকল্পে এ সকল দুর্নীতির বিষয়ে সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নাম জড়িয়ে আছে । বিয়য়টি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে , সুষ্ঠু তদন্তের মাধ‍্যমে সত‍্য উদঘাটন করা জরুরি ।

“জুলাইগণঅভ্যুত্থান শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল‍্যান ও পুনর্বাসন অধ‍্যাদেশ-২৬” সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। দেশবাসীর কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে,গণঅভ্যুত্থানেরমর্মও আদর্শকে জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ‍্যে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।

এই অধ‍্যাদেশ জুলাই যোদ্ধা বা তাদের পরিবারের সদস‍্যদের প্রতি সরকারের সহযোগিতার হাত উন্মোচিত হয়েছে এবং এটা তাদের জন‍্য বড় সম্মাননা। সেক্ষেত্রে জুলাই স্মৃতি-জাদুঘর নির্মাণের বিয়য়ে বিকল্প চিন্তা করা যেতে পারে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম, সোনালী ব‍্যাংক।