তুষার বিশ্বাস, গোপালগঞ্জ : সব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ফেরেজা বেগম (৬০)। বুক চাপড়ে, বিলাপ করে তিনি শুধু বলছিলেন, আমার ছেলে মেয়ে নাতনিদের মাইরা ফ্যালাইছে। আমার কলিজার টুকরাকে শেষ কইরা দিল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো রে আল্লাহ...। ছেলে-মেয়ে -নাতনিদের হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শারমিনের মা ফেরেজা বেগম।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে গলাকেটে শারমিন আক্তার তার ৩ মেয়ে ও ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। এ খবর শারমিনের বাবার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামে আজ শনিবার সকালে এসে পৌঁছায়। তারপর থেকে শারমিনের মা ও স্বজনদের আহাজারিতে পুরো বাড়ি ভারি হয়ে উঠেছে।

শোকার্ত ফেরেজা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার বাজান গতকাল নতুন জামা-প্যান্ট কিনছে। সেই জামা পরে হাসতে হাসতে বোনের বাড়ি গাজীপুর গেছে। কে জানত, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া! আমার রসুল আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন। তোরা আমার রসুলরে আইনা দে...। এ কথা বলেই আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পাশে থাকা স্বজনেরা তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সন্তানের শোকে মুহূর্তেই আবার ভেঙে পড়েন এই মা। শুক্রবার (৮ মে) ফোরকান চায়না কম্পানীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে রসুলকে তার ভাড়ার বাসায় ডেকে নেয়। পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার জন্য তাকে ডেকে নেওয়া হয় রসুলের মা অভিযোগ করেন।

নিহতরা হলেন- গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের পাইকান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাত মোল্লার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩০) তাঁর ৩ মেয়ে মিম আক্তার (১৪), হাবিবা (১০) , দেড় বছরের শিশু ফারিয়া ও ভাই রসুল মোল্লা (১৯)।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শাহাদাত মোল্লা ও ফেরেজা বেগম দম্পতির ৪ মেয়ে ও ৩ ছেলের (সাত ছেলে মেয়ের) মধ্যে শারমিন আক্তার তৃতীয় ও রসুল মোল্লা সবার ছোট। বড় মেয়ে বিয়ের কয়েক বছর পর জটিলরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এখন এক সাথে দুই সন্তানকে মেরে ফেলল।

নিহত শারমিন ও রসুলের প্রতিবেশী আবেদ আলী মীর বলেন, বাব-মায়ের সামনে সন্তানদের হত্যা করা হলে বাবা-মা কিভাবে বেঁচে থাকে। আমাদের ভাই গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার)। অনেক কষ্ট করে অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে সন্তানদের বড় করেছে। রসুল মোল্লা গাজীপুরে একটি পোশাক তৈরি কারখানায় চাকরী করতো। থাকতো বড় বোন ফাতেমার বাসায়। শুক্রবার (৮ মে) রসুল শারমিনের বাসায় যাওয়ার পর রাত ৮ টায় মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সবাই ভেবেছিলো ফোনে হয়তো চার্জ নেই। ভোর সাড়ে ৫ টায় জামাইয়ের ভাই (ফোরকান মোল্লার ভাই) জব্বার মোল্লা ফোন করে বলে শারমিনের বাসার সবাই মারা গেছে। কিভাবে মারা গেলো জানতে চাইলে সে বলে, তার ভাই তাদের ফোন করে জানিয়েছে পরিবারের সবাইকে শেষ করে ফ্যালাইছি আমাকে খুঁজলে আমাকে পাওয়া যাবেনা বলে ফোন কেটে দেয়। খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

পারিবারিক সূত্রে জানাগেছে, ১৭ বছর আগে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ি গ্রামের আতিয়ার মোল্লার ছেলে ফোরকান মোল্লার সঙ্গে সামাজিকভাবে শারমিন আক্তারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর কয়েক বছর শ্বশুরবাড়িতে থাকত ফোরকান। পর তাঁরা ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। এ দম্পত্তির সংসারের একে একে ৩টি মেয়ে জম্ম নেয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবদ লেগে থাকতো। পারিবারিক কলহের জেরে ১ বছর আগে ৩ মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসে শারমিন। গত ডিসেম্বরে ঝগড়া না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ভাড়া বাসায় নিয়ে যায় ফোরকান। ফোরকান পেশায় প্রাইভেটকার চালক। তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন বলেও দাবি স্থানীয়দের অভিযোগ।

প্রতিবেশী আবেদ আলী মীর বলেন, আইনী প্রক্রিয়া মরদেহ গাজীপুর থেকে গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে আনার পর দাফন করা হবে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সন্ধ্যা ৭ টায় মরদেহ নিয়ে স্বজনরা গাজীপুর থেকে গোপালগঞ্জে রওনা দিতে পারেননি।

(টিবি/এসপি/মে ০৯, ২০২৬)