গুজব প্রচার সাংবাদিকতা নয়
আবদুল হামিদ মাহবুব
আমি গত কদিন যাবত দেশের বাইরে অবস্থান করছি। আছি যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিতে। আজ ভোরে (বাংলাদেশ তখন সন্ধ্যা) ফেসবুকের নিউজফিডে চোখ রাখতেই আমার আক্কেল গুরুম! বিএনপির দেশি-বিদেশি নেতাদের ছবি সম্বলিত ফটো কার্ড দিয়ে আমার পরিচিত অনেক সাংবাদিকই লিখছেন অমুক অমুক আগামীর মন্ত্রী। বিষয়টি হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রসারণ হবে এমন সম্ভাব্য কথা ধরে প্রচারণা। কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঘাঁটালাম, কয়টিতে এবিষয়ে সংবাদ পেলাম। এক একটি পোর্টাল ভিন্ন ভিন্ন জনের নাম লিখে সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে ডাক পাচ্ছেন এমন কথাও লিখে দিয়েছে! দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রের পেজগুলো ঘেঁটে এটার কোন সত্যতা আমি পাইনি যদিও, তবে কয়েকটি সংবাদপত্র (যেগুলো প্রচার বেশি না) এই বিষয়ে সংবাদ ছাপ হয়েছে, এটা পেয়েছি। এইসব গুজব নির্ভর সাংবাদিকতা দেখে, আমাকে এই লেখাটা লিখতে হচ্ছে। গুজব প্রচার কখনোই সাংবাদিকতা নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রসারণ একটি পরিচিত শব্দ। সরকার গঠনের পর। কিংবা রাজনৈতিক সংকটের সময়। অথবা প্রশাসনিক ভারসাম্য আনার প্রয়োজনে। এমন আলোচনা প্রায়ই ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। সম্ভাবনার রাজনীতি এখন সংবাদে রূপ নিচ্ছে। আর সেই সম্ভাবনাকেই অনেকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। অনলাইন পোর্টাল। ইউটিউবভিত্তিক সংবাদচ্যানেল। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা পেজেও। সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম এসেছে। কেউ দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা। কেউ প্রবাসী রাজনীতিক। কেউ দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। আবার কেউ কেবল গুঞ্জনের শিকার।
প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী এমন নাম প্রকাশ কতটা যৌক্তিক? স্পেকুলেশন বা অনুমান কি গুজব নয়? আর এসব প্রচার কি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মধ্যে পড়ে? এই প্রশ্নগুলো এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হচ্ছে সত্যতা যাচাই। কোনো তথ্য প্রকাশের আগে সেটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হতে হয়। শুধু শোনা যাচ্ছে, বা দলীয় সূত্র বলছে ধরনের অস্পষ্ট বাক্য সাংবাদিকতার মানদণ্ড পূরণ করে না। বিশেষ করে যখন কোনো ব্যক্তির সম্মান, রাজনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয় জড়িত থাকে।
মন্ত্রিপরিষদ গঠন একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এটি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তের অংশ। সাধারণত প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাকেন্দ্র ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য খুব সীমিত পরিসরে থাকে। ফলে আগেভাগে সম্ভাব্য তালিকা প্রকাশ মানেই সেখানে অনিশ্চয়তার বড় অংশ থেকে যায়। এখানেই 'স্পেকুলেশন' শব্দটি আসে।
স্পেকুলেশন মানে অনুমানভিত্তিক আলোচনা। এটি সবসময় মিথ্যা নয়। আবার সবসময় সত্যও নয়। কিন্তু সাংবাদিকতার ভাষায় স্পেকুলেশনকে তথ্য হিসেবে পরিবেশন করা বিপজ্জনক। কারণ পাঠক তখন সেটিকে সত্য বলে ধরে নেন। আর সেখান থেকেই গুজবের জন্ম হয়। গুজবের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো; এটি অনিশ্চিত তথ্যকে নিশ্চিত রূপে ছড়িয়ে দেয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই কাজটিই আরও দ্রুত করছে। একটি অনলাইন পোর্টাল 'সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকা' প্রকাশ করল। এরপর ফেসবুকে সেটি কপি হলো। ইউটিউবে বিশ্লেষণ শুরু হলো। তারপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ছবি দিয়ে লেখা হলো; 'অভিনন্দন'। এখানেই সাংবাদিকতার সীমা অতিক্রম করে প্রচারণা শুরু হয়।
এ ধরনের আচরণ শুধু অদায়িত্বশীল নয়। অনেক ক্ষেত্রে অনৈতিকও। কারণ একজন রাজনৈতিক নেতার নাম প্রকাশের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক মর্যাদা জড়িত। তিনি যদি শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী না হন, তাহলে তার সমর্থকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়। অনেক সময় দলীয় অভ্যন্তরেও ভুল বোঝাবুঝি জন্ম নেয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিব্রত অবস্থায় পড়েন।
সাংবাদিকতার নীতিমালা এখানে স্পষ্ট। যে কোনো অসমর্থিত তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে; এমন তথ্য প্রকাশের আগে দ্বিগুণ যাচাই প্রয়োজন। সূত্রের বরাত দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং সূত্র কতটা নির্ভরযোগ্য, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশে বহু সংবাদমাধ্যম এখন 'ক্লিকভিত্তিক সাংবাদিকতা'-র ফাঁদে আটকে যাচ্ছে। আগে খবরের গুরুত্ব বিবেচনা করা হতো। এখন গুরুত্ব পাচ্ছে ভিউ, শেয়ার ও ভাইরাল হওয়া। ফলে রাজনৈতিক গুঞ্জনও সংবাদে পরিণত হচ্ছে। আর সেই সংবাদ আবার সামাজিক মাধ্যমে আবেগী সমর্থকেরা আরও বাড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নেতার সমর্থক হওয়া অপরাধ নয়। রাজনৈতিক আনুগত্যও স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে দলীয় প্রচার চালানো গ্রহণযোগ্য নয়। যদি কেউ শুধুই প্রশংসা করতে চান, সেটি রাজনৈতিক প্রচারণা হতে পারে। কিন্তু সেটিকে সংবাদ বলা যাবে না। সংবাদ ও প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য খুব স্পষ্ট; সংবাদ তথ্য দেয়। প্রচারণা আবেগ তৈরি করে। সংবাদ প্রশ্ন তোলে। প্রচারণা প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। সংবাদ যাচাই করে। প্রচারণা বিশ্বাস করতে বলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এই সীমারেখা প্রায় ভেঙে গেছে। অনেকেই সাংবাদিক নন। কিন্তু সংবাদ বিশ্লেষকের ভূমিকায় কথা বলছেন। কেউ কেউ নির্দিষ্ট নেতার ছবি ব্যবহার করে 'আগামী মন্ত্রী' লিখছেন। অথচ এর পক্ষে কোনো সরকারি ঘোষণা নেই। কোনো নির্ভরযোগ্য দলীয় ব্রিফিংও নেই।
তাহলে প্রশ্ন আসে, সরকারের পক্ষ থেকে কি সত্যিই মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে? রাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা আলোচনা থাকতে পারে। সরকার পরিবর্তন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বা রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নও থাকতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার ভাষায় 'আলোচনা চলছে' আর 'সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে'! এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
এখন পর্যন্ত সরকার বা দায়িত্বশীল কোনো সরকারি মুখপাত্রের পক্ষ থেকে যদি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসে, তাহলে সম্ভাব্য নাম প্রকাশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। সাধারণত নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতা কী করে? তারা বলে 'অমুক সূত্রে আলোচনা রয়েছে' 'চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি' 'সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি'। অর্থাৎ তারা অনিশ্চয়তার জায়গাটি পরিষ্কার রাখে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেটি করা হচ্ছে না।
বরং শিরোনামেই নিশ্চিত ভঙ্গি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন ;যারা হচ্ছেন মন্ত্রী, কিংবা নতুন মন্ত্রিসভায় চমক, প্রবাসী নেতা পাচ্ছেন পতাকা, এ ধরনের বাক্য পাঠককে বিভ্রান্ত করে। এটি দীর্ঘমেয়াদে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে।আমি আমার সাংবাদিকতার সকল সময় বলে এসেছি সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আস্থা। পাঠক যদি মনে করেন সংবাদমাধ্যম যাচাই ছাড়া তথ্য প্রকাশ করছে, তাহলে একসময় প্রকৃত সংবাদও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তখন সমাজে তথ্যের সংকট তৈরি হয়। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এ কারণেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এখন আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা পরিবর্তনের সময়ে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বাড়ে। কারণ মানুষ তখন নির্ভরযোগ্য তথ্য খোঁজে। তারা গুজব নয়, সত্য জানতে চায়। একজন পেশাদার সাংবাদিক কখনোই কেবল ভাইরাল হওয়ার জন্য নাম প্রকাশ করেন না। তিনি জানেন, একটি নামের সঙ্গে একজন মানুষের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ জড়িত থাকতে পারে। তাই তিনি যাচাই করেন। দ্বিতীয় সূত্র নেন। সরকারি প্রতিক্রিয়া খোঁজেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেন। তারপর সংবাদ প্রকাশ করেন। এটাই নৈতিক সাংবাদিকতা।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। গণমাধ্যম স্বাধীন মানেই সীমাহীন নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়বদ্ধতাও থাকে। কোনো সংবাদ সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ালে, রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ালে বা ব্যক্তিগত মর্যাদাহানি ঘটালে সেই দায় সংবাদমাধ্যম এড়াতে পারে না। আজকের ডিজিটাল যুগে গুজবের গতি অনেক দ্রুত। একটি ফেসবুক পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে সাংবাদিকদের দায়িত্ব আরও বেড়েছে। কারণ ভুল তথ্যের প্রভাব এখন অনেক গভীর।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সব আলোচনা সংবাদ নয়। সব সম্ভাবনা সত্য নয়। আর সব 'সূত্র' নির্ভরযোগ্যও নয়। সাংবাদিকতা কখনো অনুমানের ওপর দাঁড়াতে পারে না। সাংবাদিকতার ভিত্তি হতে হবে যাচাই, ভারসাম্য ও দায়িত্ববোধ।
মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রসারণ হবে কি হবে না, সেটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কে মন্ত্রী হবেন, সেটিও সরকারের এখতিয়ার। কিন্তু তার আগেই মানুষের নাম ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করা কোনো সুস্থ গণমাধ্যমচর্চা নয়।
সংবাদমাধ্যমের কাজ হওয়া উচিত জনস্বার্থ রক্ষা করা। জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা নয়। আজ যখন তথ্যের চেয়ে প্রচারণা দ্রুত ছড়ায়, তখন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ সত্য দেরিতে এলেও, শেষ পর্যন্ত সত্যই টিকে থাকে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
