আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন- বুধবার (১৩ মে) বেইজিং সফরকালে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে ‘একটা দীর্ঘ, শক্ত আলিঙ্গন’ দেবেন। তবে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি মনে করছে- তাইওয়ান, শুল্ক, বিরল খনিজ ও ইরান যুদ্ধসহ দুই দেশের মধ্যে থাকা একাধিক জটিল ইস্যুর কারণে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে হয়তো দূরেই রাখবেন জিনপিং।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির নেতার এই বৈঠকে বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে তাইওয়ান প্রশ্ন, পারস্পরিক শুল্ক আরোপ, বিরল খনিজ রপ্তানি ও ইরান যুদ্ধ।

দুই নেতার যোগাযোগ ও কূটনৈতিক আচরণের ধরনও একেবারেই ভিন্ন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের প্রায়ই দেখা যায় উচ্চকণ্ঠ, নাটকীয় ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াভিত্তিক আচরণ। বিপরীতে শি জিনপিংকে দেখা যায় অনেক বেশি সংযত, হিসেবি ও কম কথার কূটনীতিক হিসেবে।

গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, বেইজিং পৌঁছালে শি তাকে ‘একটা দীর্ঘ, শক্ত আলিঙ্গন’ দেবেন। তখন তিনি আরও বলেন, আমরা খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ও খুব ভালোভাবে একসঙ্গে কাজ করছি।

তবে চীন এ বিষয়ে একেবারেই ভিন্ন অবস্থান নেয়। সফরটি যে সত্যিই হচ্ছে, তা সোমবার (১১ মে) পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি বেইজিং। কূটনৈতিক ইস্যুতে চীনের সংযত অবস্থানের এটিকেই স্বাভাবিক উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যদিও দুই নেতার ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক শৈলীতে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, তবুও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার (১১ মে) বলেছে, চীন মনে করে- বেইজিং-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘নেতা থেকে নেতা’ কূটনীতি ‘অপরিবর্তনীয় কৌশলগত দিক নির্দেশনামূলক ভূমিকা’ পালন করে।

বুধবার (১৩ মে) শুরু হতে যাওয়া ট্রাম্পের এই চীন সফর হবে ২০১৭ সালের পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। আর সেটিও ছিল ট্রাম্পের নিজেরই সফর।

প্রথম মেয়াদের সেই সফরে ট্রাম্পকে চীন ‘স্টেট ভিজিট-প্লাস’ মর্যাদা দিয়েছিল। তখন তাকে ‘নিষিদ্ধ নগরী’ বা ‘ফরবিডেন সিটিতে’ ব্যক্তিগত চা-আড্ডার ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়েছিল।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের এই সফরে ট্রাম্পকে টেম্পল অব হেভেন ঘুরিয়ে দেখানো ও রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন থাকলেও নয় বছর আগের মতো জাঁকজমক এবার দেখা যাবে না।

সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর আমেরিকান স্টাডিজের পরিচালক উ শিনবো এএফপিকে বলেন, ট্রাম্পের প্রথম সফরের পর চীন বুঝে গেছে- অতিরঞ্জিত সম্মান ও প্রশংসা ট্রাম্পের অহমকে তুষ্ট করলেও, সেটি চীনের প্রতি তার মনোভাবের দ্রুত পরিবর্তন ঠেকাতে পারে না।

‘কম রোমান্টিক’ সম্পর্ক
সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক বার্ট হফম্যান সোমবার প্রকাশিত এক নিউজলেটারে লিখেছেন, ২০১৭ সালে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ট্রাম্প-শি সম্পর্ককে ‘ব্যক্তিগত কূটনীতির মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা ও বৃহৎ শক্তির কূটনীতির নতুন অধ্যায়’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।

কিন্তু ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ধারাবাহিক চীনবিরোধী নীতিগত অবস্থান ও দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই ভয়াবহ বাণিজ্যযুদ্ধ বেইজিংকে সেই ধারণা থেকে সরে আসতে বাধ্য করে।

হফম্যান লিখেছেন, ২০২৫-২০২৬ সালে ট্রাম্প যুগের পুনরুজ্জীবিত ভাষ্য এখন নেতা-নেত্রীর ব্যক্তিগত রসায়ন নিয়ে অনেক কম রোমান্টিক, যদিও ট্রাম্প এখনো শির সঙ্গে নিজের বন্ধুত্বের কথা প্রায়ই উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এখন আর এই বিশ্বাস নেই যে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক পুরো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বদলে দিতে পারে। তবে এটুকু স্বীকৃতি রয়েছে যে এই সম্পর্ক অন্তত ‘সম্পর্ক ভেঙে পড়া ঠেকাতে, যোগাযোগের পথ পুনরায় চালু করতে ও কৌশলগত সমঝোতা তৈরি করতে’ সহায়তা করতে পারে।

সম্প্রতি বেইজিং আরও বেশ কয়েকজন বিদেশি নেতার জন্যও লালগালিচা বিছিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিংয়ে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে বিশেষভাবে স্বাগত পাওয়া অতিথিদের মধ্যে ছিলেন।

এছাড়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও বেইজিংয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর চেংদুতেও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছিলেন।

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির নেতাদের মধ্যকার সম্পর্ক পুরোপুরি কৃত্রিম নয়। বেইজিংয়ের ইউনিভার্সিটি অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের অধ্যাপক জন গং এএফপিকে বলেন, তার মনে হয় ট্রাম্প ও শি আসলেই একে অপরের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে চলেন।

তিনি বলেন, আমার মনে হয়, তাদের মধ্যে সত্যিকারের একধরনের উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বহু জটিল ইস্যুকে ছাপিয়ে যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আগামী মাসে ৮০ বছরে পা দিতে যাওয়া ট্রাম্প ও তার একদিন পরই ৭৩ বছরে পা দিতে যাওয়া শি জিনপিং সর্বশেষ সরাসরি সাক্ষাৎ করেছিলেন গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি আঞ্চলিক সম্মেলনের ফাঁকে।

সেই বৈঠকে দুই নেতা বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে এক বছরের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিলেন। ওই বাণিজ্যযুদ্ধে বহু পণ্যের ওপর শুল্ক ১০০ শতাংশেরও বেশি হয়ে গিয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বৈঠকের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ। এটি এখন দুই দেশের বিরোধপূর্ণ দীর্ঘ ইস্যুতালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে।

এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বাণিজ্য কূটনীতিক ওয়েন্ডি কাটলার গত সপ্তাহে ‘জিওইকোনমিক কম্পিটিশন’ পডকাস্টে বলেন, এবারের বৈঠক থেকে বড় ধরনের ফলাফলের প্রত্যাশা ‘সীমিত’ হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, এ বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে আরও কয়েকটি বৈঠক হতে পারে। তাই সব ধরনের সমঝোতা বা ঘোষণা প্রথম বৈঠকেই আসতে হবে, এমন নয়।

তথ্যসূত্র : এএফপি

(ওএস/এএস/মে ১২, ২০২৬)