মানি লন্ডারিং মামলা
সাতক্ষীরা জেলা শ্রমিকলীগের সাবেক সভাপতি সাইফুল ও তার মেয়ে ফারাজানা কারাগারে
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : প্রতারণার অভিযোগে দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং মানি লন্ডারিং এর মামলায় সাতক্ষীরা জেলা শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি সাইফুল করিম ও তার মেয়ে ফারজানা করিমের জামিন আবেদন না’মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সাতক্ষীরার জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ মোঃ নজরুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উভয়পক্ষের শুনানী শেষে তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
জামিন না’মঞ্জুর হওয়া সাইফুল করিম সাবু সাতক্ষীরা শহরের পৌরদীঘি এলাকার (প্রাণসায়ের) মৃত আব্দুল করিমের ছেলে। ফারজানা করিম শহরের পলাশপোলের মোস্তফা মাহমুদের স্ত্রী ও সাইফুল করিমের মেয়ে।
মামলা ও ঘটনার বিবরনে জানা যায়, শ্যামনগরের বিশিষ্ঠ ব্যবসায়ি ফণীভূষণ দাস ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল ও ১০ জুন ঢাকার ব্রাক ব্যাংক লিঃ এর শাখা হতে ক্লিয়িারিং এর মাধ্যমে দেড় কোটি টাকা এফডিআর ও ডাবল বেনিফিট স্কিমের উদ্দেশ্যে ট্রাষ্ট ব্যাংক শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ শাখায় জমা দেন। ট্রাষ্টি ব্যাংকের ওই শাখার তৎকালিন সহকারি ব্যবস্থাপক মোস্তফা মাহমুদ গ্রাহক ফণীভূষণকে ভুয়ো রসিদ দেন। ২২ মে ব্যাংক থেকে ১০০ পাতার এফডিআর বই খোয়া গেছে মর্মে সহকারি ব্যবস্থাপক মোস্তফা মাহমুদ ২৪ মে শ্যামনগর থানায় ১০৫৮ নং সাধারণ ডায়েরী করেন। ব্যাংক ব্যবস্থাপক ইফতেখারুল ইসলামের তত্বাবধায়নে কাজ করতেন মোস্তফা মাহমুদ।
এফডিআর বই হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ট্রাষ্টি ব্যাংকের সকল শাখাকে অবহিত করা হয়। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ ফণিভূষণ দাস ঢাকার বসুন্ধরা শাখা থেকে ৫০ লাখ টাকা ট্রাষ্ট ব্যাংকের মুন্সিগঞ্জ (শ্যামনগর) শাখায় এফডিআর উপস্থাপন করেন। একইভাবে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ শ্যামনগরের র্স্বনালী দাস তার মা মঞ্জু রানী দাসকে দিয়ে ট্রাষ্টি ব্যাংকের মুন্সিগঞ্জ শাখার ১০ লাখ টাকার এফডিআর ডাবল ডিপোজিট স্কিম করার জন্য টাকা জমা দেন। সহকারি ব্যবস্থাপক মোস্তফা মাহমুদ বাড়িতে যেয়ে স্বর্ণালী দাসকে ভুয়ো রসিদ দেন। এ ছাড়াও রামচন্দ্র দাস, বাপ্পি চন্দ্র দাস এফডিআর এর জন্য টাকা দিলেও তাদেরকে ভূয়ো রসিদ দেন মোস্তফা মাহমুদ। গ্রাহকের কোন প্রকার সাক্ষর ছাড়াই স্ক্যান কপির মাধ্যমে ফাণ্ড ট্রান্সফারের অনুমোদন দেন ব্যবস্থাপক ইফতেকারুল ইসলাম।
মোস্তফা মাহমুদ নিয়ম বহির্ভুত পে অর্ডারের মাধ্যমে তার শ্বশুর শ্রমিক লীগ নেতা সাইফুল করিমের সাতক্ষীরা প্রাইম ব্যাংকের হিসাবে জমা করেন। সাইফুল করিম পরবর্তীতে তার মেয়ে ফারজানা করিমের নামে ২০ লাখ টাকা ট্রান্সফার করেন। সাইফুল করিম জামাতার পে অর্ডারের মাধ্যমে পাওয়া ৩৩ দশমিক ৪৪ লাখ টাকা নিজে উত্তোলন ও অন্যকে হস্তান্তর করেন। ফণীভূষণ দাস তার টাকা মোস্তফা মাহমুদ আত্মসাৎ করেছেন দাবি করে ট্রাষ্টি ব্যাংকের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে ট্রাষ্টি ব্যাংকের মুন্সিগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মোঃ মোবারিজুর ইসলাম বিষয়টি দুদক খুলনার কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়েমোবারিজুর ইসলামকে মামলার নির্দেশ দেয় দুদক। সে অনুযায়িমোঃ মোবারিজুর ইসলাম ২০১৯ সালের ৭ মে সাতক্ষীরা সদর থানায় সাবেক সহকারি ব্যবস্থাপক মোস্তফা মাহমুদ ও ব্যবস্থাপক ইফতেখারুল ইসলামের নামে দূর্ণীত দমন প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। দুদকের সহকারি পরিচালক আল আমিন মামলাটি তদন্ত করে ২০২৫ সালের ১৪ আগষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে এজাহারভুক্ত দুইজন ছাড়াও সাইফুল করিম সাবু, তার মেয়ে ফারজানা করিম ও ট্রাষ্টি ব্যাংকের মুন্সিগঞ্জ শাখায় চুবিক্ত ভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কালিগঞ্জের কাকশিয়ালি গ্রামের আব্দুল্লাহ আল আমিনকে আসামী শ্রেণীভুক্ত করা হয়। আব্দুল্লাহ আল আমিনের বিরুদ্ধে আমানতকারিদের এফডিআরের ৮২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আত্মসাতের সত্যতা মেলে। এমনকি মোস্তফা মাহমুদসহ অভিযোগপত্রে উল্লেখিত আসামীরা মোট দুই কোটি ১৫ লাখ টাকা আমানতকারিদের এফডিআরের জমা দেওয়া টাকা ভুয়া রসিদ ও নিয়ম বহির্ভুত পে অর্ডারের মাধ্যমে আত্মসাত করেছেন মর্মে প্রতীয়মান হয়।
গত ৬ এপ্রিল সাতক্ষীরার জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ মোঃ নজরুল ইসলাম অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে অন্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে সাতক্ষীরা কারাগারে থাকা মোস্তফা মাহমুদসহ সকল আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়ে ১২ মে পরবর্তী ধার্য দিন দেন। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার সাইফুল করিম সাবু ও তার মেয়ে ফারজানা করিম তাদের আইনজীবী অ্যাড. এম শাহ আলমের মাধ্যমে আদালতে জামিন আবেদন করেন। একইসাথে অণ্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা মোস্তফা মাহমুদকে এই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন জানানো হয়। দুদকের সাতক্ষীরা আদালতের বিশেষ পিপি অ্যাড. আসাদুজ্জামান দিলু জামিনের তীব্র বিরোধিতা করলে আদালত বাবা ও মেয়ের জামিন আবেদন না’মঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
দুদকের সাতক্ষীরা আদালতের বিশেষ পিপি অ্যাড. আসাদুজ্জামান দিলু এ প্রতিবদেককে সাইফুল করিম সাবু ও ফারজানা করিমের জামিন আবেদন না’মঞ্জুর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
(আরকে/এসপি/মে ১৩, ২০২৬)
