উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত: রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব
ড. মাহরুফ চৌধুরী
বর্তমান যুগে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখল বা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিযোগিতা নয়; এটি ভাষা, প্রতীক, আবেগ, মনস্তত্ত্ব এবং কৌশলগত যোগাযোগের এক বহুমাত্রিক ক্ষেত্র। দৃশ্যমান বক্তব্যের আড়ালে প্রায়শই কাজ করে অদৃশ্য বয়ান-নির্মাণের প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য থাকে গণমানুষের চিন্তা, অনুভূতি, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করা। রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই ভাষা কখনো নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং তা হয়ে ওঠে প্রভাব বিস্তার, বৈধতা নির্মাণ, প্রতিপক্ষকে অবমাননা এবং জনমত নিয়ন্ত্রণের একটি সূক্ষ্ম অস্ত্র। এই জটিল বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ ধারণাটি তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে সামনে আনা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা, তার মনস্তত্ত্ব এবং এর অন্তর্নিহিত অনৈতিক কৌশলকে উন্মোচন ও ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। এ শব্দবন্ধটিকে কেবল ভাষার একটি অলঙ্কারিক রূপক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি রাজনৈতিক যোগাযোগ (পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন), প্রোপাগান্ডা স্টাডিজ, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবতত্ত্ব এবং সমালোচনামূলক বচন-বিশ্লেষণের (ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স অ্যানালাইসিস) আলোকে বিশ্লেষণযোগ্য একটি কাঠামো, যেখানে ভাষা কেবল বাস্তবতাকে বর্ণনা করে না, বরং বাস্তবতাকে নির্মাণও করে। ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক নরম্যান ফেয়ারক্লাফ (১৯৪১-) দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও ভাষার সম্পর্ক কখনো নির্দোষ নয়; রাজনৈতিক ভাষা প্রায়ই এমনভাবে নির্মিত হয় যাতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বৈধ এবং অন্য গোষ্ঠীকে অগ্রহণযোগ্য বা ‘অপর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষায় ধীরে ধীরে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের জায়গা দখল করে আবেগ, ভয়, সন্দেহ ও ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস।
এই প্রেক্ষাপটে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘ক্ষমতা ও জ্ঞান’ (পাওয়ার এন্ড নলেজ) ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, জ্ঞান ও সত্য কখনো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; বরং ক্ষমতার বিন্যাসের মধ্য দিয়েই ‘সত্য’ গঠিত, প্রচারিত এবং পুনর্গঠিত হয়। অর্থাৎ যে গোষ্ঠী ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক সময় ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমেই ঠিক করে দেয় কোনটি গ্রহণযোগ্য সত্য এবং কোনটি অগ্রহণযোগ্য। একইভাবে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির (১৮৯১–১৯৩৭) ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (কালচারাল হেজিমনি) তত্ত্ব দেখায়, শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমেও নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক ভাষণ, সামাজিক প্রচারণা কিংবা সাংস্কৃতিক বয়ানের মাধ্যমে এমন এক মানসিক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের অজান্তেই অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অপরিহার্য’ বলে মেনে নিতে শুরু করে।
রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা তাই কেবল প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে ‘অপরায়ণ’ (আদারিং) প্রক্রিয়ায় কোণঠাসা করে ফেলে। এই অপরায়ণের লক্ষ্য হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে যুক্তির ময়দান থেকে সরিয়ে নৈতিক, সামাজিক কিংবা মানসিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম শিক্ষা হলো, ঘৃণা, অপবাদ, গুজব কিংবা মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণের ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ান সাময়িকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই সামাজিক আস্থা গড়ে তুলতে পারে না। কারণ মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম প্রচারণার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেই ফেলে।
সাধারণ জনগণের কাছে রাজনৈতিক সম্মতি আদায়ের কুটকৌশলী প্রক্রিয়াটি প্রায়শই শুরু হয় ‘উপ্ত’ স্তরের মধ্য দিয়ে। এই স্তরে মূলত গণমানুষের চেতনায় একটি নির্দিষ্ট ধারণা, ভয় কিংবা সন্দেহের বীজ বপন করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করার লক্ষ্যে সচেতনভাবে কিছু শব্দ, প্রতীক, অভিযোগ ও ইঙ্গিত ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণটি সাধারণত প্রত্যক্ষ নয়; বরং এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের মনে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অবিশ্বাস, আশঙ্কা কিংবা নৈতিক অস্বস্তি গড়ে তোলা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বপনকৃত ধারণাগুলো সামাজিক আলোচনায়, গণমাধ্যমে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় এবং দৈনন্দিন কথোপকথনে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে একসময় তা অনেকের কাছেই ‘স্বাভাবিক সত্য’ বলে মনে হতে শুরু করে।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘কাঠামোবদ্ধতার প্রভাব’ (ফ্রেইমিং ইফেক্ট) এবং ‘ঊদ্দেশ্য নির্ধারণ’ (এজেন্ডা সেটিং) কৌশলের একটি সম্মিলিত প্রয়োগ, যেখানে একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে মানুষের উপলব্ধি ও বিচারবোধ সেই কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ মানুষ কী ভাববে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষকে কী নিয়ে ভাবানো হবে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড স্যামুয়েল হারম্যান (১৯২৫–২০১৭) এবং ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কির (১৯২৮-) ‘প্রোপাগান্ডা মডেল’ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে। তাঁদের মতে, গণমাধ্যম প্রায়ই নিরপেক্ষ তথ্যবাহক হিসেবে নয়, বরং একটি ‘ছাকনি পদ্ধতি’ (ফিল্টারিং সিস্টেম) হিসেবে কাজ করে, যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে কোনো ধারণা বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে তা প্রশ্নাতীত সত্যের মর্যাদা পেয়ে যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপরায়ণ প্রক্রিয়ায় এই ‘উপ্ত’ ধাপের বহুমাত্রিক প্রয়োগ বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা ট্যাগকে পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হয়েছে। কখনো ‘রাজাকার’, কখনো ‘স্বৈরাচার’, কখনো ‘দেশবিরোধী’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’, আবার কখনো ‘পাকিস্তানী দালাল’ বা ‘ভারতীয় দালাল’— এই ধরনের ভাষাগত লেবেলিং কেবল রাজনৈতিক মতভেদের পরিচায়ক নয়; বরং এটি একটি নৈতিক বিচারের রায় আরোপের কৌশলও বটে। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে যুক্তি কিংবা তথ্য-উপাত্তনির্ভর প্রমাণের ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। ফলে রাজনীতি আর কেবল নীতিগত মতবিনিময়ের ক্ষেত্র থাকে না; তা পরিণত হয় ‘নৈতিক বৈধতা বনাম নৈতিক অযোগ্যতা’র এক সংঘাতে। এখানেই ভাষা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অস্ত্র হয়ে ওঠে, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে ‘অপর’-এ রূপান্তরিত হয়।
এরপর আসে ‘সুপ্ত’ স্তর, যেখানে সম্ভাব্য পরিবর্তন, নতুন চিন্তা কিংবা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে নিঃশব্দে নিস্তেজ করে দেওয়া হয়। এটি সরাসরি দমন নয়; বরং জনমনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্লান্তি উৎপাদনের কৌশল। যখন কোনো সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের দাবি জোরালো হতে শুরু করে, তখন সেই দাবিকে প্রকাশ্যে অস্বীকার না করে বরং সময়ক্ষেপণ, আংশিক স্বীকৃতি, বিভ্রান্তিকর আশ্বাস কিংবা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ‘ঘুম পাড়িয়ে’ দেওয়া হয়। যেমনটি দেখা গিয়েছে সাম্প্রতিক জুলাই সনদ নিয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থানে। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তার প্রতিবাদী শক্তি ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। এখানে ওয়াল্টার লিপম্যানের (১৮৮৯-১৯৭৪) ‘সম্মতি তৈরি’ (ম্যানুফেক্চারিং কনসেন্ট) ধারণা এবং উল্লেখিত হারম্যান-চমস্কির বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ক্ষমতাসীন বয়ান এমনভাবে পরিবেশিত হয় যে মানুষ নিজের অজান্তেই সেই বয়ানের সঙ্গে আপস করে ফেলে, কিংবা অন্তত বিরোধিতা করার নৈতিক তাগিদ হারিয়ে ফেলে। মনোবিজ্ঞানে একে অনেক সময় ‘চেনাজানা অসহায়ত্ব’ (লার্ন্ড হেল্পলেসনেস)-এর সঙ্গেও তুলনা করা যায়, যেখানে মানুষ বারবার ব্যর্থতা বা প্রতিরোধহীনতার অভিজ্ঞতায় একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শিক্ষার্থী আন্দোলন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলন কিংবা নাগরিক সমাজের বিভিন্ন দাবিকে প্রায়ই এই ‘সুপ্ত’ কৌশলের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে। আন্দোলনকে সরাসরি দমন না করে কখনো সংলাপের আশ্বাস, কখনো বিভক্তি সৃষ্টি, কখনো আংশিক দাবি মেনে নেওয়ার অভিনয়— এসবের মাধ্যমে তার গতি মন্থর করে দেওয়া হয়েছে। ফলে জনমনে জন্ম নেয় ক্লান্তি, হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী অনীহা; যা শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকেই শক্তিশালী করে।
তৃতীয় ধাপ ‘গুপ্ত’; এটি হলো অন্তরাল থেকে পরিচালিত মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যগত কৌশলের স্তর। এখানে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে থেকে গোপনে প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি কিংবা চরিত্রহননের কাজ পরিচালিত হয়। এই পর্যায়ে তথ্য বিকৃতি, গুজব ছড়ানো, আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য হিসেবে উপস্থাপন, কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করা হয়। ফলে জনগণ অনেক সময় বুঝতেই পারে না কোনটি বাস্তব, আর কোনটি নির্মিত বয়ান। সত্য ও মিথ্যার সীমানা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করে দেওয়া হয়। ডিজিটাল যুগে এই ‘গুপ্ত’ প্রক্রিয়া আরও জটিল ও বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। অ্যালগরিদমিক বায়াস, ইকো-চেম্বার, বট-নিয়ন্ত্রিত প্রচারণা, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষের মনোজগৎকে প্রভাবিত করার নতুন নতুন কৌশল তৈরি হয়েছে। মার্কিন সমাজ-মনোবিজ্ঞানী সোসানা জুবফের (১৯৫১-) ‘নজরদারি পুঁজিবাদ’ (সার্ভাইল্যান্স ক্যাপিটালিজম) ধারণা এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের আচরণগত তথ্য (বিহেভিয়ারাল ড্যাটা) সংগ্রহ করে তাদের সিদ্ধান্ত, পছন্দ ও রাজনৈতিক প্রবণতাকে প্রভাবিত করার এক নতুন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘গুপ্ত’ কৌশল আরও সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী হয়েছে। নামবিহীন প্রচারণা, সংগঠিত ট্রল-সংস্কৃতি, বিভ্রান্তিমূলক ভিডিও, বিকৃত তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফটোকার্ড গুজবের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি মোকাবিলা না করেও তাকে ঘিরে এক ধরনের নেতিবাচক আবহ তৈরি করা সম্ভব হয়, যা ধীরে ধীরে সামাজিক উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে।
সবশেষে আসে ‘লুপ্ত’ স্তর, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কার্যত জনপরিসর থেকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এটি কেবল প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে না; বরং সামাজিক বা সামষ্টিক স্মৃতি, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনআলোচনার পরিসর থেকেও তাকে অদৃশ্য করে দেওয়ার প্রয়াস চালানো হয়। কোনো ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শকে যদি দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, তবে একসময় তার বক্তব্য, উপস্থিতি ও রাজনৈতিক বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন তার মতামতকে গুরুত্বহীন, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়। যোগাযোগতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে ‘প্রতীকী নিশ্চিহ্নকরণ’ (সিম্বলিক অ্যানাইহিলেশন) বলা হয়। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়োর (১৯৩০-২০০২) ‘প্রতীকী ক্ষমতা’ (সিম্বলিক পাওয়ার) ধারণাটিও এখানে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা, প্রতীক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে এমন এক ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়, যা অনেক সময় প্রত্যক্ষ সহিংসতার চেয়েও কার্যকর। কারণ দৃশ্যমান দমন প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু প্রতীকী দমন মানুষের চেতনাকেই পরিবর্তন করে দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী কণ্ঠকে প্রান্তিক করে দেওয়া, তাদের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করা, কিংবা তাদের বক্তব্যকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা এই ‘লুপ্ত’ প্রক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি গভীর সত্য হলো, কোনো মত, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তিকে ভাষাগত ও প্রতীকীভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা সাময়িক সাফল্য আনতে পারলেও তা স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতি বা সামাজিক আস্থা তৈরি করতে পারে না। কারণ দমন করা বাস্তবতা প্রায়শই নতুন রূপে, নতুন ভাষায় এবং নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে আবার ফিরে আসে।
প্রতিপক্ষকে অপরায়ণের আলোচ্য এই চার ধাপ তথা ‘উপ্ত’, ‘সুপ্ত’, ‘গুপ্ত’ ও ‘লুপ্ত’ পর্যায়ের সমন্বিত প্রয়োগই গড়ে তোলে রাজনৈতিক আক্রমণের একটি সুসংগঠিত মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো। এখানে ভাষা কেবল বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের উপলব্ধি, আবেগ, ভয়, ঘৃণা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশলগত প্রযুক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বারবার একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে যে, এই ধরনের কুটকৌশল সবসময় ক্ষমতাসীনদের জন্য প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনে না; বরং অনেক সময় তা উল্টো বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। কারণ সাধারণ মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জীবন যখন এক পর্যায়ে গিয়ে আরোপিত বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, তখন চাপা দেওয়া কণ্ঠস্বর আরও প্রবল প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। যে ভাষা দিয়ে মানুষকে নীরব করতে চাওয়া হয়েছিল, সেই ভাষার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় প্রতিবাদের নতুন অভিধান। ভাষা তখন আর কেবল শাসনের হাতিয়ার থাকে না; এটি হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অস্ত্র।
ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গণআন্দোলনই এ সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। ক্ষমতার একমুখী ভাষাকে মানুষ শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করেছে স্লোগানে, কবিতায়, দেয়াললিখনে, গণসমাবেশে এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে। তখন ভাষা হয়ে ওঠে নিপীড়নের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানের ঘোষণাপত্র। ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদার (১৯৩০-২০০৪) ভাষায়, কোনো বয়ান কখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত থাকে না; তার ভেতরেই থাকে বিপরীত অর্থের সম্ভাবনা। অর্থাৎ যে ভাষা দিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, সেই ভাষাই একসময় প্রতিরোধের শক্তিতে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪-এর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেখা গেছে, রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আরোপিত ভাষা ও পরিচয়ের বিপরীতে আন্দোলনকারিরা নিজেদের বিকল্প ভাষা তৈরি করেছে। ক্ষমতার ভাষা যেখানে মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে, জনগণ সেখানে সেই সংজ্ঞাকেই উল্টে দিয়েছে। ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ এই স্লোগান যেমন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে প্রতিষ্ঠা করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, তেমনি ‘কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ প্রতি-স্লোগান হিসেবে ফিরে এসে সেই বয়ানের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ ও প্রতিরোধের ভাষায় পরিণত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, ভাষা কখনো একমুখী নয়; ঊদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাষার ভেতরেই নিহিত থাকে প্রতিরোধের সম্ভাবনা, প্রতিবাদের শক্তি এবং জালেমের মুখে মজলুমের চপেটাঘাত করার মোক্ষম সামর্থ্য।
বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতাসীনদের এই ধরনের কুটকৌশল নতুন কিছু নয়। যুগে যুগে, নানা ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবল এর ভাষা ও প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু রাজনৈতিক কুটকৌশলের মূল মনস্তত্ত্ব প্রায় একই থেকেছে। প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে শুরু করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শক্তি প্রায়ই প্রতিপক্ষকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘অপর’ বানানোর রাজনীতি ব্যবহার করেছে। আর সেটা করেছে কখনো ধর্মের নামে, কখনো জাতীয়তাবাদের নামে, কখনো নিরাপত্তার অজুহাতে, আবার কখনো নৈতিকতার ভাষায়। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি থেকেও মানুষ খুব কমই শিক্ষা নিয়েছে। অতীতের অপকৌশল, বিভাজন ও তার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও, একই ধরনের রাজনৈতিক কৌশল নতুন মোড়কে বারবার ফিরে আসে। তাই এখানে ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতা (হিস্টোরিক্যাল ডায়ালেক্টিক্স) এবং ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের (রিপ্রোডাকশন অব পাওয়ার) তত্ত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আন্তোনিও গ্রামশি, লুই আলথুসার (১৯১৮–১৯৯০) কিংবা মিশেল ফুকোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের মাধ্যমে টিকে থাকে না; বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়েও নিজেকে পুনরুৎপাদন করে। দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। শাসনব্যবস্থার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হলেও, শাসনের ভাষা, রাজনৈতিক বিভাজনের কৌশল এবং ‘দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহিতা’র দ্বৈত বয়ান প্রায়ই একই থেকে যায়। ফলে স্বাধীনতার পরও অনেক সমাজ ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের নতুন সংস্করণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারে না।
অতএব, প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক দল, ক্ষমতা বা কৌশল নিয়ে নয়; বরং আমাদের ‘সামষ্টিক রাজনৈতিক চেতনা’ (কলেক্টিভ পলিটিক্যাল কন্সাসনেস) নিয়েও। আমরা কি সত্যিই এই ভাষার রাজনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক খেলাকে বুঝতে পারছি? আমরা কি তথ্য, স্লোগান ও প্রচারণাকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করছি, নাকি অজান্তেই নির্মিত বাস্তবতার অংশ হয়ে যাচ্ছি? কারণ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই ঘটে, যখন মানুষ বুঝতেই পারে না যে তার চিন্তার কাঠামোও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই জায়গায় ‘সমালোচনামূলক নাগরিকত্ব’ (ক্রিটিক্যাল সিটিজেনশীপ) এবং জনশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়; বরং ইতিহাসবোধ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং ভিন্নমতকে সহ্য করার মানসিকতাও একটি সচেতন নাগরিক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। গণসচেতনতা ছাড়া নেতিবাচক রাজনীতির এই কায়েমী স্বার্থবাদী কুটকৌশলের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নাগরিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি, ব্যক্তিপূজার প্রবণতা, পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি চর্চা এবং প্রশাসনে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে অনেক সময় রাজনৈতিক মতভেদ যুক্তি বা নীতিনৈতিকতার ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে পরিচয়গত বৈরিতায় রূপ নেয়, যেখানে প্রতিপক্ষকে বোঝার চেয়ে ধ্বংস করার আকাঙ্ক্ষাই বড় হয়ে ওঠে। আর সেখানেই গণতন্ত্রের ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি এবং স্বৈরতন্ত্র আরও পেশিনির্ভর ও মারমুখী হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে রাখা দরকার যে, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে নিহিত থাকে না; তা নিহিত থাকে সচেতন, সমালোচনামুখর ও নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের মধ্যে। তারা কেবল শোনে না, প্রশ্ন তোলে; কেবল বিশ্বাস করে না, বিশ্লেষণ করে; কেবল আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় না, বরং যুক্তি, ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার আলোকে সত্যকে অনুধাবনের চেষ্টা করে। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো ‘সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা’ (ক্রিটিক্যাল সিভিক কন্সাসনেস), আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো অন্ধ আনুগত্য, ভয়, গুজব ও নির্মিত বিভ্রমের কাছে আত্মসমর্পণ। যে সমাজে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেখানে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে কেবল নির্বাচনী আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু যে সমাজে নাগরিকেরা চিন্তা করে, বিতর্ক করে এবং ক্ষমতার ভাষাকে বিশ্লেষণ করে, সেখানেই গণতন্ত্র তার প্রকৃত প্রাণশক্তি খুঁজে পায়।
এই ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ অপরায়ণ প্রক্রিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশলের বর্ণনা নয়; এটি ক্ষমতা কীভাবে ভাষা, মনস্তত্ত্ব ও প্রতীকের মাধ্যমে বয়ান তৈরি করে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তারই এক গভীর প্রতিফলন। এই কুটকৌশল ভাঙার একমাত্র উপায় হলো সেই সমালোচনামূলক সচেতনতা, যা সত্যকে আড়াল থেকে তুলে এনে প্রকাশ্যে দাঁড় করাতে পারে; যা প্রচারণার শব্দগুচ্ছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে শনাক্ত করতে পারে; যা রাজনৈতিক লেবেলিং, দলীয় আনুগত্য কিংবা আবেগতাড়িত বিভাজনের পরিবর্তে ন্যায়, যুক্তিসঙ্গত বিচার-বিশ্লেষণ ও মানবিকতার ভিত্তিতে ব্যক্তি, ঘটনা ও মতাদর্শকে মূল্যায়ন করতে শেখায়। অন্যথায়, সমাজ ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থার দিকে এগোয়, যেখানে ভাষা আর যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিভাজন, ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই কোনো ক্ষমতাকাঠামো নিজেকে চিরস্থায়ী বলে মনে করেছে, তখনই ভাষাকে ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিপক্ষকে অমানবিক, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। লক্ষ্যণীয় যে, প্রাচীন সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক রাষ্ট্র পর্যন্ত ক্ষমতার এই প্রবণতা প্রায় একই থেকেছে। কখনো ‘জাতির শত্রু’, কখনো ‘দেশদ্রোহী’, কখনো ‘অসভ্য’, কখনো ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ এসব ভিন্ন ভিন্ন শব্দের আড়ালে একই মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে। মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষকে এমনভাবে চিহ্নিত করা, যেন তাকে আর সমান নাগরিক বা বৈধ রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা না করা হয়। জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন চিন্তক হান্না আরেন্ট (১৯০৬-১৯৭৫) তাঁর ‘সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণবাদের উৎস’ (দ্যা অরিজিন্স অব টোটালিটারিয়ানিজম) বইটিতে দেখিয়েছিলেন, কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে মানুষ ধীরে ধীরে বাস্তবতা ও প্রচারণার পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন সত্য আর তথ্য-উপাত্ত বা দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় ক্ষমতার প্রয়োজন অনুযায়ী আগ্রাসী প্রোপাগান্ডায়। ফলে যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে প্রতিরোধের স্লোগান বা গালিই একসময় ইতিহাসের বিকল্প ভাষা হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, আমরা যদি এই মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক কৌশলগুলোকে বুঝতে ব্যর্থ হই, তবে হয়তো বারবার একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সাক্ষী হয়ে থাকব- কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো নীরব সমর্থক হিসেবে, কখনো আবার নিজেদের অজান্তেই তার অংশ হয়ে। তখন ব্যক্তি বদলাবে, দল বদলাবে, শাসনের মুখ বদলাবে; কিন্তু শাসনের ভাষা, অপকৌশল ও মানসিক কাঠামো একই থেকে যাবে। আর সেখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি ফিরে আসে- মানুষ প্রায়ই ইতিহাসের সাক্ষী হয়, ইতিহাস পড়ে, ইতিহাস নিয়ে কথা বলে; কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।
অপরদিকে ইতিহাস এটাও দেখিয়েছে যে, মানুষের ভেতরে জমে থাকা নীরব ক্ষোভ, অপমানবোধ ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতা একসময় প্রতিরোধের ভাষায় বিস্ফোরিত হয়েছে। চাপা দেওয়া কণ্ঠস্বর কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো দেয়াললিখনে, কখনো স্লোগানে বা গালিগালাজে, কখনো গণঅভ্যুত্থানের গর্জনে ফিরে এসেছে। শাসকের আরোপিত শব্দই অনেক সময় শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্লোগানে পরিণত হয়েছে। কারণ ভাষার একটি দ্বৈত চরিত্র আছে। এটি যেমন আধিপত্যের হাতিয়ার, তেমনি মুক্তি ও প্রতিরোধেরও শক্তি। ফলে যে সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার সংকুচিত হয়, সেখানে স্লোগানই একসময় ইতিহাসের বিকল্প ভাষা হয়ে ওঠে যা নিপীড়িত ক্ষুব্ধ মানুষের জমে থাকা অভিজ্ঞতা ও প্রতিবাদকে প্রকাশ করে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, আমরা যদি এই মনস্তাত্ত্বিক রাজনৈতিক কৌশলগুলোকে বুঝতে ব্যর্থ হই, তবে হয়তো বারবার একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সাক্ষী হয়ে থাকবে জাতি। তখন ব্যক্তি বদলাবে, দল বদলাবে, শাসনের মুখ বদলাবে; কিন্তু শাসনের ভাষা, বিভাজনের কৌশল এবং ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব একই থেকে যাবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘অপর’ বানানোর সংস্কৃতি নতুন নতুন নামে ফিরে আসবে, আর সমাজ বারবার একই চক্রে আবর্তিত হতে থাকবে।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
