ছুটি থেকে ভাতা- সব কাজেই দিতে হয় টাকা
টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না শ্যামনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী জাহিদ
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকলেও অদৃশ্য কারণে ব্যবস্থা নেয়ানি কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে অফিস প্রধানের কাছে বড় অঙ্কের টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ওই প্রধান সহকারী ছুটি অনুমোদন, শ্রান্তি বিনোদন ভাতা, এ.সি.আর, মাতৃত্বকালীন ছুটি অনুমোদনসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রেও ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, অফিস প্রধান জাহিদ হাসান দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের নারী স্টাফদের আর্থিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করে আসছেন। তার আচরণে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে আউটসোর্সিংয়ের ১৩ জন কর্মচারীর বেতন বিল সম্পন্ন করার জন্য এক লাখ ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এছাড়া অবসরে যাওয়া কর্মচারীদের পেনশন বিল ছাড় করতেও মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, এক বা দুই দিনের সাধারণ ছুটির ক্ষেত্রেও টাকা ছাড়া কোনো কাজ করে না অফিস প্রধান জাহিদ হাসান। শ্রান্তি বিনোদনের বিলের একটি অংশ অফিস প্রধানকে দিতে হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি হাসপাতালের বাবুর্চিখানার ঠিকাদারের কাছ থেকেও নিয়মিত টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে রোগীদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
এছাড়া লেবার ওয়ার্ডে দায়িত্ব পেতে মাসিক চাঁদা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রোগীদের ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করা হয় এবং নবজাতক কোলে দেওয়ার সময় প্রাপ্ত বকশিশের অর্থেরও অংশ দিতে হয়।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করে জানান, মাতৃত্বকালীন ছুটি নিতে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে শ্রান্তি বিনোদন ভাতা ও অন্যান্য বিলের বিপরীতে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে অফিস প্রধানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানেও একইভাবে অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তারা দাবি করেন।
অভিযোগপত্রের অনুলিপি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পরিচালক (শৃঙ্খলা প্রশাসন), পরিচালক স্বাস্থ্য খুলনা এবং সিভিল সার্জন সাতক্ষীরার কাছেও পাঠানো হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত অফিস প্রধান জাহিদ হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি বর্তমানে দুই দিনের ছুটিতে রয়েছেন। শনিবার অফিসে এসে সরাসরি কথা বলার আহবান জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান জানান, লিখিত অভিযোগটি তিনি হাতে পাননি। তবে তিনি বলেছেন, অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছে। সেগুলো আমি যাচাই-বাছাই করেছি। সেখানে কিছু অভিযোগ সত্য, আবার কিছু অভিযোগ অসত্য পাওয়া গেছে। পরে তাকে (প্রধান সহকারী জাহিদ হাসানকে) সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও যদি একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি আপাতত সমাধান হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে জানিয়েছেন, প্রধান সহকারী জাহিদ হাসান তার অবৈধ ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থের একটি অংশ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে বণ্টন করেন। এ কারণেই বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও অপকর্মের অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে দাবি তাদের। এছাড়া একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
(আরকে/এসপি/মে ১৪, ২০২৬)
