রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছায় দারুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানার ২০২২ -২০২৩ ও ২০২৩- ২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়েছে।  প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নায়েবে মুহতামিম (উপাধ্যক্ষ) মাওলানা মঈনুদ্দীনের জবাবদিহিতাবিহীন স্বেচ্ছাচারিতা, কতিপয় শিক্ষককে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে একনায়কতন্ত্র কায়েম,  মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালনা কমিটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎসহ স্বৈরাচারী শাসনের ভয়াবহ দৃশ্য উঠে এসেছে।

সাতক্ষীরা দারুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা সূত্রে জানা গেছে, শহরের ইটাগাছা মোড়ে ১৯৯৯ সালে এ প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ বিশ্ববিদ্যালয় ও বেফাকের গঠণতন্ত্র অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে মাওলানা আব্দুর রহমান দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০০৬ সালের ১৯ জানুয়ারি এতিমখানাটি সমাজসেবা অধিদপ্তর নিবন্ধন দেয়। আব্দুর রহমানের শ্যালক মাওঃ মঈনুদ্দিন সহকাারি আরবী শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। কয়েক বছর যাবৎ আব্দুর রহমান শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার সূযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের পছন্দের চার শিক্ষককে সঙ্গী করে সিণ্ডিগেটের মাধ্যমে মঈনুদ্দিন ওই প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য তিনি মাদ্রাসার পাঠদানের দায়িত্বসহ বের্ডিং এর বোর্ডিং সুপারের দায়িত্ব, কোষাধ্যক্ষ এর দায়িত্ব ও নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব এককভাবে দায়িত্ব হাতিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানে দেড় হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। মঈনুদ্দিনের স্বেচ্ছাচারিতায় ২০২৬ সালের ১৬ই জানুয়ারি ওই প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ট শিক্ষক মাওলানা হাফেজ আব্দুল করিম, মুফতি আবু উবাইদা, মুফতি আব্দুল মাতিন, মুফতি জাহিদুল ইসলাম ও মাস্টার আফজাল হোসাইন (অডিট সদস্য ) চাকুরি ছেড়ে দিয়েছেন।২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মোঃ আব্দুর রব ওয়ার্ছির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় বা বিভিন্ন বিল-ভাউচার দেখাতে বললে নিজেকে এতিমখানার সভাপতি দাবি করে কাগজপত্র না থাকলেও সবকিছু কম্পিউটারে সংরক্ষিত আছে বলে জানান মঈনুদ্দিন।

প্রতিষ্ঠান ২টিতে এতিমখানার পরিচালনা কমিটি সহ সর্বমোট ১৪টি কমিটি ছাড়াও এতিমখানার সাধারন কমিটি, উপদেষ্টা কমিটি, নিয়োগ কমিটি, এতিম যাচাই-বাছাই কমিটি ও মালামাল ক্রয় কমিটি নামে আর ও ৫টি কমিটি ও ৩টি উপ-কমিটি থাকলেও গঠণতন্ত্র অনুযায়ি তাদের কোন কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ত্রুটিপূর্ণ বিল দাখিল করে মঈনুদ্দিন নগদ উৎকোচ ৭৪ হাজার টাকা দেখিয়ে রেজুলেশন ছাড়াই ব্যাংক থেকে ১৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা তুলেছেন। কোন ক্রয় কমিটির তোয়াক্কা না করেই রসিদ বহির্ভুত ১১ লাখ ২৪ হাজার ১৪৯ টাকার আসবাবপত্র কিনেছেন। একইভাবে নির্মাণখাতে এক কোটি ২৪ লাখ আট হাজার ৩৮ টাকা, জমি কেনা বাবদ ৬৬ লাখ ৯১ হাজার ৮৩১ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

শিক্ষক বা কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা বিবেচনা না এনে তিনি নিজ স্বার্থে বিশেষ সুবিধা নিয়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দিচ্ছেন। শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা চাইলে তাদের প্রতি খারাপ ব্যবহার করেন এবং পাওনা পরিশোধে হয়রানী করে থাকেন। মাওঃ মঈনুদ্দীন সাহেবের তার দুই চাচাত বোন ও ভাগ্নিদের নিকট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাওনা লক্ষাধিক টাকা সমুদয় টাকা হিসাব থেকে বাদ দিয়েছেন। একাধিক দায়িত্ব পালক করায় বিভিন্ন দায়িত্ব বাবদ তিনি অতিরিক্ত বেতন উত্তোলন করলেও তার কোন হিসেব দেন না মঈনুদ্দিন। তথ্যাদি গোপন করে নিরীক্ষা কার্যক্রমের ব্যাঘাত ঘটানোসহ তার অনিয়ম ও দূর্ণীতির বিরুদ্ধে মামলা করাসহ অবিলম্বে পরিচালনা কমিটির জরুরী সভা ডেকে প্র্রতিষ্ঠানটি যাতে নিয়মানুযায়ী চলতে পারে তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করা হল।

এ ব্যাপারে মাওঃ মঈনুদ্দিন তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার না করেই বলেন, তিনি নিরীক্ষা প্রতিবেদন পাননি। তাছাড়া যা বলার ডাঃ আবুল কালাম বাবলা-ই সব বলবেন।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা দারুল উলুম মাদ্রসাা ও দারুল উলুম এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ডাক্তার আবুল কালাম বাবলার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। ধর্ম প্রতিষ্ঠান বিধায় বিশ্বাসের জায়গাও থাকে। প্রতিষ্ঠানটিতে কিছু অনিয়ম ধরা পড়ায় তিনি নিজেই তার নিরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ি সব কিছু করা হবে।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সায়েদুর রহমান মৃধা মাওলানা মঈনুদ্দিনের ৭৪ হাজার টাকা ঘুষের কথা মিথ্যা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

(আরকে/এএস/মে ১৬,২০২৬)