বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে তুরস্কের পথে ইরান
স্পোর্টস ডেস্ক : ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নামার আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারতে আগামীকাল সোমবার তুরস্কের উদ্দেশে রওনা হচ্ছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। সেখানে কন্ডিশনিং ক্যাম্প ও প্রীতি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে ‘টিম মেলি’।
ইরানের প্রধান কোচ আমির ঘালেনোই শনিবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতির জন্য চেনা ভেন্যু আন্টালিয়াকেই বেছে নিয়েছে ইরান।
এর আগে গত মার্চেও সেখানে ক্যাম্প ও প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল তারা। এবার তুরস্কে যাচ্ছে ৩০ সদস্যের প্রাথমিক দল, যা পরবর্তীতে চূড়ান্ত পর্বে ফিফার নিয়মানুযায়ী ২৬ সদস্যে নামিয়ে আনা হবে।
এই দলের সবচেয়ে বড় তারকা ৩৩ বছর বয়সী সাবেক পোর্তো স্ট্রাইকার মেহেদি তারেমি, যিনি বর্তমানে খেলছেন গ্রিক ক্লাব অলিম্পিয়াকোসে।
বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড নির্বাচন নিয়ে নিজের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কোচ আমির ঘালেনোই ইরান ফুটবল ফেডারেশনের ওয়েবসাইটে বলেন, ‘বিশ্বকাপের ঠিক আগে এই শেষ ক্যাম্পের জন্য ৩০ জন খেলোয়াড় বেছে নেওয়াটা আমার কোচিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত ছিল।
’ তবে দল নির্বাচনে কোনো সমঝোতা করা হয়নি এবং সম্পূর্ণ ‘টেকনিক্যাল পারফরম্যান্স’ বিবেচনা করেই খেলোয়াড়দের দলে রাখা হয়েছে বলে জোর দেন তিনি।
ইরানের প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্বে থাকা ইরানি-কানাডীয় কর্মকর্তা স্যাম মেহদিজাদেহ জানিয়েছেন, আন্টালিয়ায় দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা রয়েছে ইরানের। যার মধ্যে আগামী ২৯ মে গাম্বিয়ার বিপক্ষে একটি ম্যাচ খেলা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে।
মাঠের প্রস্তুতির পাশাপাশি ইরানের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মার্কিন ভিসা নিশ্চিত করা। ১৯৮০ সাল থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন থাকায়, ইরানি খেলোয়াড় ও স্টাফদের ভিসার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তুরস্কের এই সময়টাকে ব্যবহার করতে হবে।
ভিসা পরিস্থিতির আপডেট দিয়ে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখনো কোনো ভিসা ইস্যু করা হয়নি।’
তিনি আরও জানান, ভিসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে খেলোয়াড়দের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) দিতে হবে। তবে ফেডারেশন চাইছে খেলোয়াড়রা যেন আন্টালিয়াতেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন, যাতে তাদের প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী আঙ্কারায় ভ্রমণ করতে না হয়।
চলমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে দলের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও ভিসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে মেহেদি তাজের।
সব আনুষ্ঠানিকতা ও ভিসা প্রক্রিয়া শেষ করে ইরান দল যখন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে, তখন অ্যারিজোনার টুসন-এ হবে তাদের মূল বেস ক্যাম্প। আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ‘গ্রুপ জি’-তে থাকা ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হবে। এরপর একই শহরে তারা মুখোমুখি হবে বেলজিয়ামের এবং গ্রুপের শেষ ম্যাচে সিয়াটেলে লড়বে মিশরের বিপক্ষে।
এদিকে নানা আলোচনা-সমালোচনা আর ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
ইস্তানবুলে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ভিসা, নিরাপত্তা ও লজিস্টিকস সংক্রান্ত তাৎক্ষণিক উদ্বেগগুলো অনেকটাই কেটে গেছে।
ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই ‘টিম মেলি’র (ইরান জাতীয় দল) ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা দূর করতে এই জরুরি বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
শনিবারের এই আলোচনাকে অত্যন্ত ‘ফলপ্রসূ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ফিফার সেক্রেটারি জেনারেল ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রোম এবং ইরান ফুটবল ফেডারেশনের (এফএ) সভাপতি মেহেদি তাজ।
যদিও বেশ কিছু সংবেদনশীল বিষয় এখনো প্রকাশ্যে অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। বৈঠকের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল, রাজনীতি যাতে কোনোভাবেই বিশ্বকাপের মূল সূচিতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, ফিফার পক্ষ থেকে সেই নিশ্চয়তা দেওয়া।
ভিসা জটিলতা বা দেশটিতে প্রবেশের অনুমতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে গ্রাফস্ট্রোম সরাসরি সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য না করলেও, তার বক্তব্যে আভাস মিলেছে যে পর্দার আড়ালে একটি কার্যকর সমাধান তৈরি করছে ফিফা। বৈঠক শেষে গ্রাফস্ট্রোম বলেন, ‘ইরান এফএ-র সাথে আমাদের একটি চমৎকার ও গঠনমূলক বৈঠক হয়েছে। আমরা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এবং ফিফা বিশ্বকাপে তাদের স্বাগত জানাতে মুখিয়ে আছি।’
এর আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে নিজেদের ম্যাচগুলো মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল ইরান। তবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মূল সূচিতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না।
সম্প্রতি কানাডায় অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে গিয়ে দেশটির প্রবেশাধিকার পাননি ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ। ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তার অতীতের সম্পৃক্ততার জেরে কানাডা সরকার তাকে ভিসা দেয়নি।
যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা উভয় দেশই আইআরজিসি-কে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে, তাই ইরানের কোনো খেলোয়াড় বা স্টাফের একই ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞায় পড়বেন কিনা তা নিয়ে বড়সড় সংশয় তৈরি হয়েছিল।
তবে এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইরান তাদের ফুটবলীয় প্রস্তুতি পুরোদমে সচল রেখেছে। ইরানি ফেডারেশন নিশ্চিত করেছে যে, বিশ্বকাপ মিশনের অংশ হিসেবে তাদের দলটি প্রথমে তুরস্কে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প করবে। এরপর জুনের শুরুতে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার টুসন-এ তৈরি করা তাদের মূল কন্ডিশনিং ক্যাম্পে যোগ দেবে।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার আগে নিরাপত্তা, নির্বিঘ্নে ভ্রমণ এবং জাতীয় দলের প্রতি যথাযথ সম্মানের দাবি জানিয়ে ফিফার কাছে একটি বিস্তারিত তালিকা জমা দিয়েছিল ইরান। ফেডারেশন প্রধান মেহেদি তাজ জানান, ফিফা তাদের উত্থাপিত প্রতিটি সমস্যা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে ফিফা ইরানের তোলা ১০টি পয়েন্টই মন দিয়ে শুনেছে এবং প্রতিটির সমাধান প্রস্তাব করেছে। আশা করি, ইনশাআল্লাহ আমাদের জাতীয় দল কোনো সমস্যা ছাড়াই বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারবে এবং সেখানে দারুণ ফলাফল বয়ে আনবে।’
অ্যারিজোনার বেস ক্যাম্পের পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সিয়াটলে যাতায়াতের সময় দলের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার দাবি করেছে ইরান। গ্যালারির দর্শক প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক বিক্ষোভ এবং খেলোয়াড়দের মাঠ ও মাঠের বাইরের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন ফিফার বিশেষ পরিকল্পনার অংশ।
(ওএস/এএস/মে ১৭, ২০২৬)
