ইমা এলিস, নিউ ইয়র্ক : বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা গত ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনটির নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের ১৭টি দেশে মোট ২ হাজার ৭০৭ জনকে বিভিন্ন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদক অপরাধ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের অভিযোগও রয়েছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে অ্যামনেস্টি ১ হাজার ৫১৮টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য নথিভুক্ত করেছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান। দেশটি ২০২৫ সালে ২ হাজার ১৫৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

অ্যামনেস্টি জানায়, ২০২২ সালে নারীদের অধিকার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান সরকার 'রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের হাতিয়ার' হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বাড়িয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিক থেকে সৌদি আরবও শীর্ষে রয়েছে। দেশটি ২০২৫ সালে অন্তত ৩৫৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, মৃত্যুদণ্ডের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ চায়না-এ সংঘটিত হাজার হাজার মৃত্যুদণ্ডের তথ্য তাদের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অ্যামনেস্টির মতে, চীন এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও গত বছর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে ২৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে ১১টি অঙ্গরাজ্যে মোট ৪৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অ্যামনেস্টির তথ্যমতে, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে গত বছর একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই অপরাধজনিত কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যায় শীর্ষে ছিল ফ্লোরিডা, যেখানে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর রন ডিসান্টিস দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। তিনি এটিকে অপরাধ দমনের 'শক্তিশালী প্রতিরোধক' এবং 'সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধীদের জন্য উপযুক্ত শাস্তি' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

২০২৩ সালে ডেসান্টিস ফ্লোরিডায় মৃত্যুদণ্ড আরোপের আইনি শর্তও সহজ করেন। এর ফলে জুরি বোর্ডের সর্বসম্মত সুপারিশ ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা বিভাগের উপপরিচালক জাস্টিন মাজ্জোলা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের 'বড় ধরনের উল্লম্ফন মূলত ফ্লোরিডার পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, সাধারণত ফ্লোরিডায় বছরে এক থেকে দুইজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো, কখনও কখনও ছয়জন পর্যন্ত হতো। কিন্তু গত বছর সেখানে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুই সপ্তাহে একজন।

অ্যামনেস্টি মৃত্যুদণ্ডকে 'চূড়ান্ত নিষ্ঠুর, অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর শাস্তি' হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সংগঠনটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বাড়লেও জনসমর্থন ক্রমেই কমছে। গ্যালাপ-এর জরিপ অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সমর্থন ছিল ৮০ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ১৯৭২ সালের পর সর্বনিম্ন।

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান মৃত্যুদণ্ড তথ্য কেন্দ্র ও একই ধরনের প্রবণতার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক রবিন মাহের বলেন, মার্কিন জুরিদের বড় অংশ এখন বিভিন্ন কারণে মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাখ্যান করছে। এর মধ্যে ন্যায্যতা ও ভুল বিচারের আশঙ্কা অন্যতম।

তিনি বলেন, ক্রমেই স্বীকৃতি বাড়ছে যে মৃত্যুদণ্ড একটি ব্যর্থ নীতি। এটি অপরাধ প্রতিরোধ বা উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি একসময় দিয়েছিল, তা পূরণ করতে পারেনি।

(আইএ/এসপি/মে ১৮, ২০২৬)