মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা ও উদ্বেগ, উৎকন্ঠা
মারুফ হাসান ভূঞা
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও প্রতিরক্ষা-ভিত্তিক প্রকাশনার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি, 'সামরিক তথ্যের সাধারণ নিরাপত্তা চুক্তি' (GSOMIA) এবং 'অধিগ্রহণ এবং পারস্পরিক সেবা চুক্তি' (ACSA) স্বাক্ষরের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইউক্রেন ভিত্তিক ম্যাগাজিন MILITARNYI এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশ তার বন্দর আর সামরিক স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে খুব শীঘ্রই। দীর্ঘদিন ধরে দেশের জনগণ এই চুক্তির বিরোধিতা করে নানা কর্মসূচি করছে। এবং অর্থনীতিবিদ, লেখক, গবেষক ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে এই চুক্তির নানা বিষয়ে সমালোচনা করছেন। কী রয়েছে এই চুক্তিতে? এবং কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে?
সরল ভাষায় বললে, এই চুক্তিতে বলা হচ্ছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক বিমান বাংলাদেশের বন্দর এবং বিমানঘাঁটিগুলো জ্বালানি সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং লজিস্টিক সহায়তার জন্য ব্যবহার করতে পারবে।
এর আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর, পায়রা বন্দর, পটুয়াখালী নৌ-ঘাঁটি ও বিশেষ করে কক্সবাজার বিএনএস পেকুয়া সাবমেরিন ঘাঁটির এলাকা ব্যবহার করা হবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের লজিস্টিকস সাপোর্ট, জ্বালানি সংগ্রহ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। বাংলাদেশের বিমানঘাঁটিগুলো ব্যবহার করা হবে মার্কিন সামরিক বিমান চলাচলের জন্য এবং অনুরূপ লজিস্টিকস সহায়তার জন্য।
অন্যান্য সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করা হবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কার্যক্ষম সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে। সাথে থাকবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও।
বাহ্যিকভাবে এটিকে সাধারণ সামরিক সহযোগিতা মনে হতে পারে, কিংবা এটিই তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো নীতি। যে নীতির মধ্যে দিয়ে বিশ্বের নানা দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বে অন্যান্য রাষ্ট্রের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায্য নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা ও অবৈধ শাসনের প্রচেষ্টার মধ্যে, এই অসম চুক্তি এবং সেটির জন্য বাধ্য করার যে প্রক্রিয়া সেটি নিয়ে উদ্বেগের জায়গাকে তীব্র করছে। অর্থাৎ কোনো একটা দেশের সাথে চুক্তি প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও সমান। সেখানে তার চেয়ে দ্বিগুণ প্রদান, কিঞ্চিৎ আদান এই পদ্ধতির ব্যবহার ঘটলে সেটি একটা রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
এমন চুক্তি যে চুক্তিতে__ দেশের প্রধান ভিত্তি অর্থনীতি, বাণিজ্য, সামরিক, বেসামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় যে সব কিছুর উপর নির্ভর করে। সে স্পর্শকাতর ঘাঁটি, বন্দর, এলাকা ও সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের অনুমোদন। যত সহজ ভাষায় দ্বিপাক্ষিক সমন্বয়, সহযোগিতার আশ্বাস শব্দ ব্যবহার করা হোক। জাতীয় নিরাপত্তা, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
আর সেটি যদি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি তবে সেখানে মৃত্যুকূপ খোঁড়ার উপাদান ছাড়া এটিকে আর কোনোভাবে বিশেষায়িত করা যায় না। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে মহা গণতান্ত্রিক রূপ আজ বিশ্ব দেখছে। এতে আস্থা, বিশ্বাসের সাথে বিশ্ব অনুধাবন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একটা চুক্তি, সাহায্য কিংবা বিসর্জন কোনো একটা দেশের উন্নয়ন বা সে দেশ নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে নয় বরং যুদ্ধ, অস্ত্র ও বোমার ঝনঝনানির ছায়া। অর্থাৎ চুক্তির অসমতায় চুক্তির ভবিষ্যৎ উন্মোচন করছে।
এই চুক্তির ফলে মূলত ভূ-রাজনৈতিক অগ্নিকুণ্ডে বাংলাদেশকে একটি পাত্র হিসেবে ব্যবহার হবে। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক' (Free and Open Indo-Pacific) কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব খর্ব করা। বাংলাদেশ এই চুক্তিতে সই করলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের চীন-বিরোধী জোটে শামিল হয়ে যাবে।
এর পরিণতি কী হতে পারে? বাংলাদেশ বর্তমানে তার অবকাঠামো উন্নয়নে চীনা বিনিয়োগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মাতারবাড়ি বা পায়রা বন্দরের মতো প্রকল্পগুলো, এমনকি দেশের গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা চীনা সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কক্সবাজারে বাংলাদেশের একমাত্র সাবমেরিন ঘাঁটিটি নির্মাণেও চীন সহায়তা করেছে।
এখন, যদি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে তাদের লজিস্টিক হাব হিসেবে ব্যবহার শুরু করে, তবে বেইজিং এটিকে তাদের 'মালাক্কা প্রণালী' কৌশল এবং 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখবে। বিশেষ করে মিয়ানমারের কিউকপিউ বন্দরে চীনের বিশাল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে। চীন নিশ্চিতভাবেই এই পদক্ষেপ সহজভাবে নেবে না। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ দুটি পরমাণু অস্ত্রধারী পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হতে পারে। অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই চীন পাল্টা ব্যবস্থা নিলে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
যদিও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে সুসম্পর্ক রয়েছে এবং উভয়ই চীনকে ঠেকাতে চায়, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে নয়াদিল্লি বঙ্গোপসাগরকে তার নিজস্ব 'প্রভাব বলয়' বলে মনে করে। বাংলাদেশের বন্দরে ভারতের ইতিমধ্যেই ট্রানজিট সুবিধা রয়েছে। এখন যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বৈশ্বিক পরাশক্তি ভারতের দোরগোড়ায় স্থায়ী সামরিক যাতায়াত শুরু করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে নয়াদিল্লিও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে না। এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে দুঃখজনক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই চুক্তি প্রক্রিয়া অসাংবিধানিকভাবে এবং একটা অদৃশ্য তৎপরতায় এটি করা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পূর্বে এই চুক্তির বিরোধিতা করলেও, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অদৃশ্য তৎপরতায় উপনীত হয়েছেন।
“সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির ফলে এ চুক্তির বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহের উর রহমান বলেন, ‘এই চুক্তি যদি দেখেন, দেখবেন বাতিল করার অপশন (সুযোগ) আছে। এক নম্বর, ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে বাতিল করে দেওয়া যাবে। দুই নম্বর হচ্ছে, এই চুক্তির মধ্যে আরেকটি কন্ডিশন (শর্ত) আছে। দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির বিভিন্ন শর্তে পরিবর্তন করতে পারে। আমি আমার জায়গা থেকে মনে করি যে অন্তত পরে যে অপশনটা বললাম, পর্যালোচনা করা। আগে আমাদের সরকারি পর্যালোচনা করা।’ উপদেষ্টা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমি এই ইস্যুতে (বিষয়ে) কথা বলেছি। আমরা সরকারের মধ্যেও এই চুক্তিটা নিয়ে কিছু পর্যালোচনা এবং চুক্তি এটা খুবই শক্তিশালী চুক্তি এবং এটা বাতিল করে দেওয়ার ইমপ্যাক্ট (প্রভাব) কী হতে পারে, নিশ্চয়ই আমরা বুঝতে পারি, কোন প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিটা স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটাও আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু ওই যে বললাম, ওই সুযোগটা তো আমরা নিতে পারি যে এই চুক্তি রিকনসিডার (পুনর্বিবেচনা) করা কিছু কিছু জায়গায়। যে যে জায়গাগুলোকে আমরা বেশি সমস্যাজনক মনে করি, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে মনে করছি, সেগুলো নিয়ে আমরা আগে আমাদের প্রাথমিক বিবেচনা করব। আমি আশা করি যে আমরা সে রকম একটা নেগোসিয়েশনে (দর–কষাকষি) তাদের সঙ্গে যেতে চাই। বাতিল করাটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফে যে সংকট আছে, সেটা আবার চলে আসার সম্ভাবনা আছে।”__ প্রথম আলো (১২ মে ২০২৬)
কিন্তু আদৌ সেটির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে? না বরং বিশেষজ্ঞরা বলছেন কোনো বিবেচনা ছাড়াই এই চুক্তি করবে বাংলাদেশ। এছাড়াও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়া ডট কম, মেরিন ইনসাইট সহ একাধিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বিদেশি সংবাদ মাধ্যম দাবি করছেন এই চুক্তিটি খুব শীঘ্রই সম্পাদিত হবে। যদি এই বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো সই হয়ে যাওয়া সম্ভাবনা থাকে বর্তমান সরকার ঐতিহাসিক ভাবে দায়ী থাকবেন। একদিকে জনগণের সামনে সরকারের এই চুক্তি অদৃশ্য রাখা, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের সংসদে এর পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা উত্থাপিত না করার প্রক্রিয়া জনগণকে ভীষণ ভাবে ভাবিয়ে তুলছে। এই চুক্তি বাতিল না হলে দেশের দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থ ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি পড়বে।
সুতরাং সরকারের করণীয় হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব রক্ষার যে দায়িত্ব তা স্মরণ করে, দেশের বুদ্ধিজীবী, গবেষক, পররাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞসহ ও সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ববৃন্দের সাথে ব্যাপক আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে এই অসম, অন্যায্য চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
লেখক : অ্যাক্টিভিস্ট।
