মানিক লাল ঘোষ


‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি...’— বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত পটভূমিতে লেখা এই একটি কালজয়ী গানই যাকে বাঙালির হৃদয়ে অমর করে রেখেছে, তিনি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফফার চৌধুরী। দেশবরেণ্য এই সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাহিত্যিক ২০২২ সালের ১৯ মে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ দেশের এক চরম ক্রান্তিলগ্নে, ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে বারবার এই গুণী মানুষটির কথা মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে, আজ যদি আবদুল গাফফার চৌধুরী বেঁচে থাকতেন, তবে তার ক্ষুরধার কলম কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠত!

১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশালের মেহন্দীগন্জের উলানিয়ার জমিদার পরিবার চৌধুরী বাড়িতে জন্ম নেন এই মহান ব্যক্তিত্ব। তার পিতার নাম ওয়াহিদ রেজ চৌধুরী। মায়ের নাম জোহারা খাতুন। ছাত্রজীবন থেকেই তার মেধা ও মনন গড়ে উঠেছিল অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চেতনার আলোয়। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে (অনার্স) পাস করে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে গাফফার চৌধুরী কাজ করেছেন দৈনিক ইনসাফ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক পূর্বদেশের মতো শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায়। সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের জন্য তিনি স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কার সহ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবদুল গাফফার চৌধুরী সপরিবারে কলকাতা চলে যান। সেখানে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’ পত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অবরুদ্ধ স্বদেশ থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ শরণার্থী আর রণক্ষেত্রের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগাতে তার ক্ষুরধার লিখনী তখন হয়ে উঠেছিল এক একটি ধারালো অস্ত্রের মতো।

প্রবাসী সরকারের তথ্য ও বেতার দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তিনি অনন্য অবদান রাখেন। স্বাধীনতার পরও বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করতে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পটভূমি এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে তিনি নির্মাণ করেন রাজনৈতিক প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’। এ ছাড়া, মহান ভাষা আন্দোলনের অমর গাঁথা নিয়ে তাঁর গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র এবং ‘ধীরে বহে মেঘনা’র মতো চলচ্চিত্রেও জড়িয়ে আছে তাঁর অনন্য অবদান। প্রবাসে থেকেও চলচ্চিত্র ও নাট্য নির্মাণের মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার আমৃত্যু চেষ্টা করে গেছেন। ১৯৭৪ সালে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমানোর পরও প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এক বিশাল অভিভাবকের আসন লাভ করেন এবং কলামের মাধ্যমে দেশের রাজনীতির চালচিত্র আমূল ব্যবচ্ছেদ করতে থাকেন।

আমরা দেখেছি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের বুকে এক ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গেছে। পরিবর্তনের সেই স্রোতে ভেসে গেছে অনেক চেনা পরিমণ্ডল। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটি লেগেছে আমাদের ইতিহাসের মূলে, বাঙালির আবেগের জায়গায়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। যে বাড়িটি ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাকাব্যিক কেন্দ্রবিন্দু, সেটিকে যেভাবে ক্ষতবিশত করা হলো—তা দেখে আজ পুরো দেশ স্তব্ধ। আবদুল গাফফার চৌধুরী বেঁচে থাকলে নিশ্চিতভাবেই এই বর্বরোচিত ঘটনার বিরুদ্ধে এক মহাসমাবেশ ঘটাতেন তার কলামে। তীব্র ভাষায় লিখতেন—ইট-পাথরের বাড়ি ভাঙা যায়, কিন্তু বাঙালির হৃদয় থেকে কি বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলা সম্ভব?

আজ ক্ষমতার অলিন্দে এবং রাজপথে এক অদ্ভুত উন্মাদনা আমরা লক্ষ্য করছি। মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস বিকৃতির এক সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চলছে। যে দলটির নেতৃত্বে, যার তর্জনীর হেলনে এ দেশের মানুষ ৯ মাস যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন মানচিত্র ছিনিয়ে এনেছিল, সেই ঐতিহ্যবাহী ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হচ্ছে। একই সাথে দেশজুড়ে চলছে মব জাস্টিস বা মব সন্ত্রাস। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল মানুষ নিজেদের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিন্দুমাত্র বিচার-বিশ্লেষণ বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই আজ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে ঢালাওভাবে কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। লাখ লাখ মুজিবাদর্শের সৈনিক ও নেতাকর্মী আজ নিজ দেশে পরবাসী, তাদের ওপর চলছে অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। প্রতি হিংসার রাজনীতির এই করাল গ্রাস এ দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এই অন্ধকার সময়ে আবদুল গাফফার চৌধুরীর মতো একজন নির্ভীক রাজনৈতিক অভিভাবকের বড় বেশি প্রয়োজন ছিল। তিনি বেঁচে থাকলে লন্ডনে বসেই তার ভাঙা আঙুল দিয়ে কলম ধরে বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিতেন। তিনি তার স্বভাবসুলভ যৌক্তিক বিশ্লেষণে সবসময় বিশ্বাস করতেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলকে জোর করে নিষিদ্ধ করে বা লাখ লাখ কর্মীকে নির্যাতন করে আদর্শকে কখনো মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসের চাকা সাময়িকভাবে উল্টো দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করা হলেও সত্যের আলো একদিন প্রকাশ পাবেই, এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিনাবিচারে ঢালাও বন্দিত্ব কখনোই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না।

তিনি একা একাই তার লেখার মাধ্যমে এই মব সন্ত্রাস এবং ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে এক অদম্য জনমত গড়ে তুলতেন। তার একেকটি কলাম হয়ে উঠত মজলুমের কণ্ঠস্বর এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক একটি শক্তিশালী বুলেট। দেশমাতৃকার এই কঠিন সময়ে দেশবরেণ্য এই সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।