রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : মামলা থেকে বাঁচতে রমেশ দাস নামে এক ইজিবাইক চালককে গ্যাস ট্যাবলেট খাইয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার সাতক্ষীরা সদরের দক্ষিণ ফিংড়ি দাসপাড়ায় এ ঘটনা ঘটনার পর থেকে থানায় মামলা না হলেও হত্যার সঙ্গে জড়িতরা আত্মগোপন রয়েছে।

মৃত রমেশ চন্দ্র দাস (৪২) সাতক্ষীরা সদরের দক্ষিণ ফিংড়ি দাসপাড়ার সত্যচরণ দাসের ছেলে।

ফিংড়ি গ্রামের উৎপল দাস জানান, তার বড় ভাই রমেশ চন্দ্র দাস ২০২২ সাল থেকে পাড়ার মোড়ে একটি মুদিখানা দোকান পরিচালনা করে আসছিলো। ব্যবসার সুবাদে প্রতিবেশি মৃত সন্দীপ দাসের বিধবা স্ত্রী সান্ত¡না দাসের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন এর পাশাপাশি পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে দাদা রমেশ দাসের। বিষয়টি ভালভাবে মেনে নেয়নি সান্ত¡না দাসের পরিবারের স্বজনরা। একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে দাদা রমেশ দাস, বউদি অনিমা দাস ও ছেলে শিশু রুদ্র দোকান থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় দুলাল দাসের ছেলে নিত্যানন্দ দাস, কেনারাম দাসের ছেলে রবিন দাস, দূঃখেরাম দাসের ছেলে দুলাল দাস ও ঝর্ণা দাসসহ কয়েকজন তাদেরকে পিটিয়ে জখম করে। তাদেরকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মামলা থেকে বাঁচতে সান্তনা দাসের ননদ ঝর্ণা দাস তড়িঘড়ি করে বাদি হয়ে ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল দাদা রমেশ দাস এর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যনালে ধর্ষণের চেষ্টা মামলা দায়ের করে। তদন্তে সত্যতা না পাওয়ায় মামলা খারিজ হয়ে যায়। আদালতে ধর্ষণ চেষ্টার মামলা দায়ের করে। তদন্তে ঘটনার সত্যতা না মেলায় মামলা খারিজ হয়ে যায়। দাদা, বউদি ও ভাইঝিকে মারপিটের ঘটনায় দাদা রমেশ চন্দ্র দাস বাদি হয়ে রবিন দাস, নিত্যানন্দ দাস ও দুলাল দাসসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় সান্ত¡না দাসকে প্রধান সাক্ষী করা হয়।

আদালত মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো সাতক্ষীরার উপর দায়িত্ব দেন। পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর উপপরিদর্শক মোঃ মাহাবুবর রহমান নিত্যানন্দ, রবিন ও দুলাল এর নাম উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। নিত্যানন্দ ও দুলাল আদালত থেকে জামিন নিলেও রবিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।গত ৬ মে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠণের পর আগামি জুন সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য করা হয়। বর্তমানে দাদা রমেশ চন্দ্র দাস ইজিবাইক চালাতো। ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল রাতে রমেশ দাসকে মারপিটের ঘটনায় তিনি ২৮ এপ্রিল থানায় ১৫৯৮ নং সাধারণ ডায়েরী করেন। তপন কুমার বিশ্বাস ডায়েরীর তদন্ত শেষে ওই বছরের ২০ মে আদালতে নিত্য দাস, রবিন দাস, ঠাকুর দাস ও দুলাল দাসের বিরুদ্ধে ২৭ নং ননজিআর মামলা দায়ের করেন। এ ছাড়া রমেশ দাস ও তাদের পরিবারকে হয়রানি করতে ঝর্ণা দাসকে দিয়ে একাধিক ১০৭/১১৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

উৎপল দাস আরো জানান, ২০২৪ সালের প্রথম দিকে নগদ টাকার দরকার হওয়ায় মেয়ে দীপ্তি দাসের এক জোড়া কানের সোনার দুল সান্ত¡নার মাধ্যমে বাবু সরকারের কাছে বন্ধক রাখে দাদা। গত ৯ মে সান্ত¡নাকে নিয়ে ওই কানের দুল ছাড়িয়ে নেয় দাদা রমেশ। বাবা সত্যচরণ দাসের কাছে পাওনা ১৫ হাজার টাকা ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ওই কানের দুল ফিরিয়ে দেওয়া হবে না বলে দাদাকে বলে সান্ত¡না নিজের জিম্মায় রেখে দেয়। সম্প্রতি ফিংড়ি বাজারের সবজি বিক্রেতা আনসার সরদারের ছেলে শহীদুল ইসলামের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে সান্তনার। এ নিয়ে দাদা প্রতিবাদ করায় শহীদুল ও সান্ত¡নার সঙ্গে সান্তনার সম্পর্কের অবনতি হয়। শহীদুল, রবিন, নিত্যা, দুলাল ও ঝর্ণা দাদাকে সম্প্রতি কয়েকবার বাজারে মারপিট করে। তাকে মেরে ফেলারও হুমকি দেয়। সোনার দুল ও রমেশকে মারপিট করার বিষয়ে কথা বলায় বাবা সত্যচরণ দাসকেও রাস্তার উপর মারপিট করে সান্তনাসহ কয়েকজন। এ সময় দাদা রমেশকে বিয়ে করার জন্য চাপ দেয় সান্ত¡না। ১১ মে সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সান্তনা দাস দাদা রমেশকে মোবাইল ফোনে ডেকে বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে তার হাতে কয়েকটি গ্যাসের ট্যাবলেট দিয়ে খেয়ে আত্মহত্যা করতে বলে সান্তনা।

গ্যাস ট্যাবলেট না খেলে পাশে অবস্থান করা রবিন, নিত্য ও শহীদুল তাকে খুন করে ফেলবে বলে জানায় সান্তনা। গ্যাস ট্যাবলেট খেতে না চাইলে মুঠোফোনে শহীদুল, রবিন ও নিত্যকে বাড়িতে ডেকে আনে সান্তনা। একপর্যায়ে তারা চারজন মিলে দাদাকে ওই গ্যাস ট্যাবলেট খেতে বাধ্য করে। এরপর দাদা দৌড়ে বাড়ি এসে এ সংক্রান্ত একটি চিরকুটে বিস্তারিত লেখার পর বমি করতে শুরু করে। এ সময় সান্ত¡না বাবা সত্যচরণকে মুঠোফোনে জানায় যে, তার ছেলে গ্যাস ট্যাবলেট খেয়েছে। তাকে নিয়ে সাতক্ষীরা ব্লীজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। ১২ মে সকালে সদর থানার উপপরিদর্শক মনিরুজ্জামান মৃত্যুর আগে দাদার হ্যা-নোট, টালিখাতা, নোটবুক ও একটি স্যাম্পনি জেড-৪২ মডেলের স্মার্ট ফোন জব্দ করে নিয়ে যান। লাশ ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

উৎপল দাসের অভিযোগ, দাদা রমেশ দাসের দায়েরকৃত মামলার সাক্ষী শুরু হওয়ায় নিজেদের বাঁচাতে সাক্ষী সান্ত¡না দাসকে ম্যানেজ করে রবিন দাস, নিত্যদাস, দুলাল দাস, ঝর্ণা দাস পরিকল্পিতভাবে জোরপূর্বক রমেশ দাসকে গ্যাস ট্যাবলেট খাইয়ে দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে। মৃত্যুর আগে দাদার লেখা হ্যা-নোট থেকে তার মেরে ফেলার কারণ ও হত্যার পরিকল্পনাকারিদের নাম উল্লেখ আছে।

সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক মনিরুজ্জামান জানান, এখনো ময়না তদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর আগে রমেশ চন্দ্র দাস চিরকুটে যা লিখে গেছেন তা তার নিজের হাতের লেখা। যাহা তার ব্যবসায়িক টালি খাতা, নোট বুকের লেখা ও মোবাইল ফোনের কথোপকথন থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ব্যাপারে রমেশ দাসের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাসুদুর রহমান জানান, রমেশ দাসের লাশের ময়না তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(আরকে/এসপি/মে ১৯, ২০২৬)