বিদ্যুতের চাপ বাড়াচ্ছে ইজিবাইক-রিকশা
বিশেষ প্রতিনিধি : ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে দ্রুত বেড়েই চলেছে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা। শহর থেকে গ্রাম সব জায়গাতেই এখন এই যানবহনরে দাপট। দেশের চরম বিদ্যুৎ সকটের মধ্যেই ঝিনাইদহ শহরসহ জেলার ছয় উপজেলায় প্রতিদিন অন্তত ৩৫ হাজার ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এসব যানবহনে চার্জ দেওয়া বাবদ প্রতিমাসে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রীডে চাপ বাড়ছে, ফলে জেলাবাসীকে এখন প্রতিনিয়ত লোডশেডিংয়ের ধকল সহ্য করতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় লোডশেডিং বেড়ে যাচ্ছে।
পৌরসভার দেওয়া তথ্যমতে, ঝিনাইদহ শহরে অনুমোদিত ইজিবাইকের সংখ্যা ২ হাজার ৫৭৬টি। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার কোনো অনুমোদন দেওয়া নেই। অথচ বাস্তবে ১৫ হাজারের বেশি ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর প্যাডেল রিকশা শহরে খাতা-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার দেখা মিলে না। সবই এখন ব্যাটারিচালিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাটারিচালিত ভ্যান।
জানা গেছে, একটি ইজিবাইকের জন্য চার থেকে ছয়টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন। আর প্রতি সেট ব্যাটারি চার্জের জন্য গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ওয়াট হিসেবে ৬ থেকে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। অপরদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানে ৬০০ ওয়াট হিসেবে ৩ থেকে ৪ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। সে হিসাবে জেলার অন্তত ৩৫ হাজার ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান চার্জের জন্য প্রতিদিন গড়ে ৪০ মেগাওয়াট এবং মাসে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। গ্যারেজগুলোতে এসব যানবহন রাতভর চার্জ দেওয়া হয়ে থাকে। একটি ইজিবাইক চার্জের জন্য গ্যারেজ মালিককে বর্তমানে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০ টাকা করে দিতে হয়। রিকশা-ভ্যানের জন্য দিতে হয় ৬০ থেকে ৮০ টাকা।
ঝিনাইদহ শহরের বেশ কয়েকটি এলাকার ইজবকাইক ও রিকাশার গ্যারেজে সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, এসব গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ দিলে প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল আসে। এ কারণে অনেক সময় গ্যারেজ মালিকরা খরচ কমিয়ে বাড়তি টাকা আয়ের জন্য অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে থাকেন। এসব অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার পেছনে রয়েছেন স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানির অসাধু কতপিয় কর্মকর্তা।
ঝিনাইদহ জেলা রিকশা-ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা সোহরাব হোসেন বলেন, ‘জেলায় ৩৫ হাজারের মত ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা-ভ্যান চলাচল করে। এ জন্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় অন্তত ছয় হাজার চার্জ দেওয়ার জন্য গ্যারেজ রয়েছে।’
সূত্র জানায়, জেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ শিল্প-কলকারখানা রাতে বন্ধ থাকে। মানুষও আলো নিভিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে পড়েন। এতে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কমে যায়। তবে সম্প্রতি মধ্যরাতে লোডশেডিং হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। এর কারণে হিসেবে জানা গেছে মধ্যরাতে গ্যারেজে গ্যারেজে ইজিবাইক-রিকশায় চার্জ দেওয়া শুরু হয়। তখন জাতীয় গ্রীডে চাপ শুরু হতে থাকে। আর সে সময় থেকে শুরু হতে থাকে লোডশেডিং।
জেলা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, ‘অনুমোদনহীন চার্জিং স্টেশন ও অবৈধ সংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক জায়গায় বাসাবাড়ির সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে ইজবাইক-রিকশায় চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বিদ্যুৎ অপচয়ও বাড়ছে। এখনই পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ইজিবাইক-অটোরিকশার সুবিধা যেমন রয়েছে, তেমনি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এর চাপও বাড়ছে। তাই এই খাতকে নিয়মের মধ্যে এনে বিকল্প জ্বালানি নির্ভর চার্জিং ব্যবস্থায় যেতে হবে।’
ওজোপাডিকো ঝিনাইদহের নির্বাহী নির্বাহী প্রকৌশলী দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা-ভ্যানগুলো চার্জ দিতে অনেক বেশি বিদ্যুৎ লাগে। তবে কী পরিমাণ লাগে এর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। চলমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকায় বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে শিগগিরই লোডশেডিং বন্ধ হয়ে যাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যেসব এলাকায় অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে গ্যারেজ তৈরি করে ইজিবাইক, রিকশা-ভ্যানে চার্জ দেওয়া হচ্ছে। সেসব গ্যারেজে শিগগিরই আমাদের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
(একে/এসপি/মে ২০, ২০২৬)
