তবে কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিকে মুক্তি দিতে চলেছে বিএনপি সরকার?
মারুফ হাসান ভূঞা
সাম্প্রতিক সময়ে অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব, নিরাপত্তা কিংবা কৌশলগত সহযোগিতামূলক চুক্তির আলোচনায় দেশের সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এই সম্ভাব্য চুক্তিগুলোর শর্তাবলী এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন সংবেদনশীল বিষয়ে ব্যাপক জনপ্রতিক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা এই চুক্তি বাতিল না করে বিবেচনার দিকটির কথা বললেও, বরং যত দিন যাচ্ছে চুক্তিটির সম্পূর্ণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারের চুক্তিটি করবার জন্য গোপনীয়তা ও পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখা যাচ্ছে। সে প্রস্তুতি কী? জনগণের যে ক্ষোভ বা সচেতন লড়াই তা বন্ধ করা? নাকি এই চুক্তির বিরোধীদের দমন করা?
মানুষ বর্তমান নির্বাচিত সরকার ও বিরোধী দলের এমন মুহূর্ত পূর্বে বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখেনি। যেখানে একদিকে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দল, শিক্ষক, গবেষকসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, আন্দোলন করছেন; সেখানে বিএনপি সরকার ও বিরোধী জামায়াত জোটের এক মহা মেলবন্ধন এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে বিস্তার লাভ করছে। সংসদে এই বিষয়ে আলোচনার জন্য বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর জোট “বাম গণতান্ত্রিক জোট” স্পিকার বরাবর স্মারকলিপি এবং দেশের পররাষ্ট্র, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরা বারবার আহ্বান জানিয়েও বর্তমান সরকার ও বিরোধী জোটকে এই চুক্তি বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
জনগণের একটি বড় অংশের আশঙ্কা, এ ধরনের চুক্তির ফলে দেশের প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে বিদেশি শক্তির পরোক্ষ প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে অগণতান্ত্রিক চর্চা এবং অন্য পরাশক্তির প্রতি যে আগ্রাসী মনোভাব, এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে প্রক্রিয়ায় অবৈধ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করে চলছে—তা থেকে বাংলাদেশের জনগণের সে সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তিকে ঘিরে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। প্রশ্ন উঠেছে চুক্তির শর্ত নিয়ে। জনগণ মনে করছে প্রতিরক্ষা চুক্তি, সামরিক তথ্য সুরক্ষার গোপনীয় চুক্তি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক চুক্তি সহ বাকি সব চুক্তির মধ্যে যে সকল অসম শর্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে, সেটি দেশের জন্য বিপজ্জনক। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যও তা হুমকি।
বাংলাদেশ যে অর্থনীতি ও যে ব্যবস্থায় রয়েছে, সেখানে ঐতিহাসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হয়। এটিই বাংলাদেশের জন্য একটি স্বচ্ছ পথ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অতিরিক্ত কৌশলগত ঘনিষ্ঠতায় আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত এবং প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার চীনের সাথে বিদ্যমান সম্পর্কে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে এবং যথারীতি এই অঞ্চলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে পড়বে।
একদিকে সীমান্তবর্তী বিদেশি পরাশক্তিদের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি, আক্রমণ অথবা কৃত্রিম সীমান্ত সংকট তৈরি করা; অন্যদিকে সেটির কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্রস্থল করা হয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-ঘাঁটি, বন্দর, বিমানবন্দর ও সামরিক স্থাপনাসহ অন্যান্য স্থাপনা ও অঞ্চলকে। এতে বাংলাদেশ পরিপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে পদার্পণ করবে। এটি কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসম চুক্তির উপর নির্ধারিত ধারণা নয়, বরং সে-সব অসম চুক্তির শর্তসমূহের যে ভাষা, শব্দ কিংবা গঠন—সেগুলোই এই ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বর্তমান নির্বাচিত সরকার চুক্তি প্রসঙ্গে কোনো বিস্তারিত আলোচনা জনসম্মুখে প্রকাশ করছে না। নানা প্রক্রিয়ায় এই চুক্তির প্রসঙ্গকে এড়িয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা এই অবৈধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিকে দিনে দিনে প্রাণ, শক্তি ও মুক্তি দিতে চলেছে বর্তমান বিএনপি সরকার।
অথচ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আলোচনা অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে থাকে। আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে আলোচনার প্রতিটি স্তর বা শর্ত জনসম্পৃক্ততায় প্রকাশ করতে হয়। দেশের বাস্তবতায় চুক্তির গুরুত্ব ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে লক্ষ্য রেখে মানুষের মতামত নিয়ে চুক্তির কাজে অগ্রসর হতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও বলা হয়, চুক্তির প্রসঙ্গ গোপন রাখার ফলে রাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে তীব্র।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রস্তাব, অন্যদিকে চীন ও ভারতের সাথে বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা। এই ত্রিমুখী সমীকরণের মধ্যে আগ বাড়িয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিলে তা অন্য পক্ষের সাথে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষেত্রেও দেখতে পেয়েছি এই চুক্তি সম্পূর্ণ করতে অসাংবিধানিক পদ্ধতিতে তড়িঘড়ি করবার দৃশ্য। বর্তমান সরকার তা ছাড়িয়ে জনসম্মুখে জবাবদিহিতা এড়িয়ে গোপনীয়তায় নির্ভর করেছে, যা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ প্রক্রিয়া। জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো চুক্তিই দেশের জন্য কল্যাণকর হবে না।
ফলে সরকারের আলোচনার ভিত্তিতে এই চুক্তিকে বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে এবং জনসম্মুখে এই চুক্তির সমস্ত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। বিশেষত চুক্তির শর্ত—যে শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যে-সব শর্তকে বলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অগণতান্ত্রিক। আরেকটি উদ্যোগ সরকারকে যেকোনো মূল্যে নিতে হবে, সেটি হলো সংসদে এই চুক্তি প্রসঙ্গে সংসদীয় পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া। নতুবা জনগণের যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তাতে জনগণ সংসদের প্রতি আস্থা হারাবে। সুতরাং সে আস্থা যেন জনগণ না হারায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী।
